শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান গ্র্যান্ড মুফতির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান গ্র্যান্ড মুফতির
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং ইয়েমেনের চলমান অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতি। ইরানের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনায় সৌদি আরবের সেনাদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্মকর্তা বা গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান।

 

গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রকাশিত একটি বিরল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এই আহ্বান জানান, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ রাজনৈতিক বা সামরিক বিষয়ে গ্র্যান্ড মুফতির এমন সরাসরি বিবৃতি প্রদানের ঘটনা সৌদি আরবের ইতিহাসে বেশ বিরল, যা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

 

গ্র্যান্ড মুফতি তাঁর বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ধর্মীয় ও জাতীয় কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রকাশিত ওই দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই মহান দেশটিকে সুরক্ষিত রাখা এবং যারা এই পবিত্র ভূখণ্ডের এক ইঞ্চি জায়গাতেও অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করার বা আগ্রাসন চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া দেশের প্রতিটি নাগরিক ও সেনাসদস্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্তব্য।

 

তিনি এই দায়িত্ব পালনকে অত্যন্ত পুণ্যের একটি ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন একটি উচ্চমার্গের ইবাদত, যা পালন করার সময় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে একজন মুমিন তাঁর নিজের জীবন এবং আত্মাকে অনায়াসে উৎসর্গ করতে পারেন।

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত সৌদি সেনাদের মনোবল বৃদ্ধি এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার বিষয়টিকে ধর্মীয় পবিত্রতার আবরণে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনারা সর্বোচ্চ সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেন।

 

বিবৃতিতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে একটি স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়েও গভীর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি আরবের পূর্ণ সমর্থনপুষ্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকারের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এই মুহূর্তে অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত জরুরি দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

গ্র্যান্ড মুফতি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, ইয়েমেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বৈধ এবং শক্তিশালী সরকারের উপস্থিতি অপরিহার্য। তিনি মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে দোয়া প্রার্থনা করে বলেন, আল্লাহ যেন সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীকে তাদের পবিত্র লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন এবং সৌদি আরব ও প্রতিবেশী ইয়েমেনকে সব ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করেন।

 

একই সঙ্গে তিনি হুথি গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিকভাবে যারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র, অর্থ বা অন্য যেকোনোভাবে সহযোগিতা করছে, তাদের চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণ পরাজয় নিশ্চিত করার জন্যও মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানান।

 

যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে সম্মুখসারিতে বা ফ্রন্টলাইনে যে সকল সৌদি সেনাসদস্য অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের প্রতি সরাসরি নির্দেশনা ও উপদেশ প্রদান করে গ্র্যান্ড মুফতি বলেছেন যে, তাদের সবচেয়ে বড় ও আবশ্যিক কর্তব্য হলো নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা।

 

তিনি সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় শাসক এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক কমান্ডারদের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আদেশ বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান। এই আনুগত্যকে তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাথে তুলনা করে বলেন, ঠিক যেমনটি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নবীর সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বর্তমান যুগের সেনাসদস্যরাও যেন সেই একই আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সৌদি আরবের সেনারা মূলত নবীর সাহাবীদের পদাঙ্কই অনুসরণ করছেন এবং বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের পবিত্র স্থানসমূহ তথা মক্কা ও মদিনার পবিত্রতা রক্ষার মতো এক মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন।

 

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কাঠামোতে গ্র্যান্ড মুফতি বা প্রধান মুফতির পদটি অত্যন্ত সম্মানজনক, সর্বোচ্চ পদমর্যাদার এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় ও আইনি কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত। তিনি পদাধিকারবলে সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ আলেম পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ইফতা স্থায়ী কমিটির প্রধান হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

 

সেই সঙ্গে দেশের যাবতীয় ধর্মীয় বিধিবিধান, আইনি কাঠামো, শিক্ষাক্রম এবং সামাজিক ও ধর্মীয় চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সঠিক ইসলামি ব্যাখ্যা ও সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা প্রদান করা তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ।

 

সৌদি আরবের মহামান্য বাদশাহ সরাসরি রাজকীয় ডিক্রি বা আদেশের মাধ্যমে এই পদে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান করে থাকেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী এই পদটি একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমমর্যাদাপ্রাপ্ত।

 

বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান অতি সম্প্রতি, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তারিখে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত রাজনৈতিক, সামরিক বা ভূরাজনৈতিক কোনো স্পর্শকাতর ইস্যুতে গ্র্যান্ড মুফতি কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন।

 

তাঁর মূল কাজ থাকে ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে। সেই ঐতিহাসিক এবং প্রথাগত দিক বিবেচনা করলে, শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজানের এই সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিবৃতিটি অত্যন্ত বিরল এবং এর একটি গভীর ভূরাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইয়েমেন সীমান্তে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি তৈরি হওয়া হুমকির কারণেই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে উজ্জীবিত করার এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

 

এই ধরনের বিবৃতি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সাধারণ সেনাদের মানসিকভাবে আরও বেশি দৃঢ় এবং আপসহীন করে তুলবে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। এই বিবৃতির পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর এই রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৪ সালে।

 

সে বছর ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছায় এবং এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর মাত্র এক বছরের মাথায়, অর্থাৎ ২০১৫ সালে ইরানের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথিরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ইয়েমেনের রাজধানী সানা আক্রমণ করে এবং তা নিজেদের পূর্ণ দখলে নিয়ে নেয়।

 

রাজধানী হুথিদের পতন হওয়ার পর ইয়েমেনের তৎকালীন বৈধ প্রেসিডেন্ট মনসুর আবদ-আল হাদি নিজের প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ইয়েমেনের ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে পুনর্বহাল করার লক্ষ্যে ওই বছর থেকেই ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে ইয়েমেন-সৌদি যৌথ সামরিক বাহিনী।

 

দীর্ঘ কয়েক বছরের তীব্র লড়াই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত চাপের পর অবশেষে ২০২২ সালে জাতিসংঘের সরাসরি মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী।

 

সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর প্রায় চার বছর ধরে ওই অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে একটি শান্ত ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে, হয়তো এবার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সকল প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সম্প্রতি পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে।

 

গত ১৩ জুলাই ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনি বাহিনীর একটি অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলার ঘটনার পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে আবারও তীব্র উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে সেই উত্তেজনা একেবারে চরম রূপ ধারণ করেছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

আর ঠিক এমন একটি সংকটময় ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতিতেই সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড মুফতির এই জীবন উৎসর্গ করার আহ্বান পরিস্থিতিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে এই ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে।

 

- রয়টার্স