জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থান করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি। শুক্রবার গভীর রাতে সেখানে উপস্থিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ ও বিশদ মতবিনিময় সভায় তিনি এই গভীর উদ্বেগ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নৌ চলাচলে যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন ঘটছে এবং যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যের প্রধান ও একমাত্র কারণ হলো ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের অব্যাহত আগ্রাসী কর্মকাণ্ড, আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা এবং উসকানিমূলক সামরিক তৎপরতা।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই অপরিসীম। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।
তাই এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে যে ভীতিকর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের যৌক্তিক অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, যখন কোনো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা চালানো হয়, প্রতিনিয়ত ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ সামরিক হুমকি দেওয়া হয়, বেআইনিভাবে সমুদ্রপথ অবরোধ করে রাখা হয় এবং নানাবিধ জবরদস্তিমূলক ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই অঞ্চলে রাতারাতি শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল খুব সহজে পুনরুদ্ধার হবে-এমন অবাস্তব প্রত্যাশা কোনোভাবেই করা যায় না।
তার এই বক্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদী অন্যায় সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বলপ্রয়োগের নীতির প্রতি একটি কঠোর, সুস্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ সমালোচনা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজ দেশের শান্তির পক্ষের অবস্থানটি অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরে ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক আরও বলেন, তেহরান সর্বদা আন্তর্জাতিক আইন, সুপ্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি এবং জাতিসংঘ সনদের মূল নীতিমালার প্রতি সর্বোচ্চ মাত্রায় শ্রদ্ধাশীল।
শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি তার দেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইরান যে সর্বদা সংঘাতের বদলে কূটনীতির পথে হাঁটতে আগ্রহী, তার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো পরমাণু সমঝোতা সম্পাদন এবং এর জটিল শর্তাবলি বাস্তবায়নে তাদের নিরলস প্রচেষ্টা।
বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত এই চুক্তি প্রমাণ করে যে ইরান আলোচনার টেবিলে বিশ্বাসী। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং তীব্র অর্থনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও গত দুই বছর ধরে ইরান অত্যন্ত ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের গঠনমূলক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তিরক্ষায় ইরানের এই গঠনমূলক, দায়িত্বশীল ও শান্তিপ্রিয় কূটনৈতিক অবস্থানের ঠিক সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নেতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি ও আলোচনার পথ পরিহার করে সংঘাত, সহিংসতা ও উত্তেজনার পথ বেছে নিয়েছে।
কূটনীতির পরিবর্তে তারা অব্যাহত আগ্রাসন, সামরিক হুমকি, গুপ্তহত্যা এবং সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধের মতো চরম মানবতাবিরোধী ধ্বংসাত্মক কৌশল অবলম্বন করছে। আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই প্রকাশ্য অবজ্ঞা ও চরম অবহেলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আজ এক ভয়াবহ ধ্বংস, রক্তপাত এবং অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই হঠকারী সিদ্ধান্তগুলো কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং বিশ্বশান্তির জন্যও এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আগ্রাসী নীতির ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও আধিপত্য বিস্তারের এই খেলায় চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
তিনি অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত ইরানবিরোধী ও আঞ্চলিক আগ্রাসনের ফলে ইতিমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই বিশাল প্রাণহানির ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
নিহত এই অসংখ্য মানুষের মধ্যে শত শত নিরীহ নারী ও অবুঝ শিশুও রয়েছে, যাদের এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বা ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে কোনো বিন্দু পরিমাণ সম্পৃক্ততা ছিল না। এই বিপুল প্রাণহানি কেবল একটি সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি পশ্চিমা আগ্রাসনের এক চরম নিষ্ঠুর, অমানবিক ও বীভৎস বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকবে।
কেবলমাত্র সামরিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের মধ্যেই ওয়াশিংটন সীমাবদ্ধ নেই, বরং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ নিয়েও তীব্র ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি।
তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি ওয়াশিংটন এখন চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে একটি স্বাধীন দেশের আপামর সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা অর্থনৈতিক অবরোধকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার এবং চাপ প্রয়োগের একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুরভাবে প্রয়োগ করছে।
তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেন যে, এই ধরনের জবরদস্তিমূলক, অন্যায় ও একতরফা পদক্ষেপ কোনোভাবেই সুস্থ কূটনীতির অংশ হতে পারে না; বরং এটি হলো নগ্ন জবরদস্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় সুনির্দিষ্টভাবে এটি এক ধরনের জঘন্য অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা, অন্যায্য ও বেআইনি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কেবল মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আদেশেরও সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যে বাধ্যতামূলক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন রায় প্রদান করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কর্মকাণ্ড ও অর্থনৈতিক নীতিমালা সেই সর্বোচ্চ আইনি রায়ের সরাসরি ও চরম লঙ্ঘন।
ওই ঐতিহাসিক আদেশে মানবিক সহায়তা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি সুস্পষ্ট ও আইনি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেই নির্দেশকে চরম অবজ্ঞা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক সন্ত্রাসের মাত্রা দিন দিন আরও বৃদ্ধি করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের ধারণাকে চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই আগ্রাসনের পথ পরিহার করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।