শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান সংকট ঘিরে দুই দেশের তীব্র সামরিক সংঘাতের শঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

ইরান সংকট ঘিরে দুই দেশের তীব্র সামরিক সংঘাতের শঙ্কা
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন সংকটময় মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মানচিত্রে নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করছে।

 

আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন শাসকদল রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে পারস্য উপসাগর তথা কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর ওপর।

 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান জলপথে ইরানের বর্তমান অবস্থান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা কৌশল কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকেই প্রভাবিত করছে না, বরং তা আসন্ন নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এবং ব্যালট বাক্সের সিদ্ধান্ত নির্ধারণে এক বিশাল নিয়ামক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

 

ফলে হোয়াইট হাউসের বর্তমান নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো কেবল বৈশ্বিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং তা অভ্যন্তরীণ দলীয় অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্ভূত পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাতারভিত্তিক জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা যে রায় দেবেন, তা কেবল ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়ন কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাবে না, বরং ইরানের সঙ্গে চলমান জটিল সংকট নিরসনে হোয়াইট হাউস ভবিষ্যতে ঠিক কতটা কূটনৈতিক নমনীয়তা বা রাজনৈতিক সুযোগ পাবে, তারও একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

 

নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জয় বা পরাজয়ের মাত্রা নির্ধারণ করে দেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে কোন ধরনের কৌশল অবলম্বন করবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার এই দ্বৈত চাপের কারণে হোয়াইট হাউসকে এখন অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হচ্ছে।

 

অধ্যাপক মাসগ্রেভের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে যদি রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং বিশেষ করে মার্কিন উচ্চকক্ষ সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসন হাতছাড়া করে ফেলে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পথ বেছে নিতে পারে।

 

এ ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনী ফলাফলের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা ঢাকার উদ্দেশ্যে হোয়াইট হাউস ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তোয়াক্কা না করে আরও একতরফা, অনমনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে চরমভাবে ঝুঁকে পড়তে পারে।

 

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় পরিসরে বিধ্বংসী সামরিক অভিযান শুরু করার একটি বাস্তব শঙ্কা তৈরি হতে পারে। মূলত নির্বাচনে পরাজয় বা আসন হারানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং অভ্যন্তরীণ ভোটারদের কাছে নিজেদের দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন না করার জন্যই এ জাতীয় ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

আমেরিকান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে পল মাসগ্রেভ আরও উল্লেখ করেছেন যে, সম্ভাব্য চরম সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রথমে সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করা হতে পারে, এবং পরবর্তীতে সেই উত্তেজনার ওপর ভিত্তি করে আলোচনার টেবিল প্রস্তুত করা হতে পারে।

 

এ ধরনের জটিল কৌশল অবলম্বন করার মূল মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য হলো মার্কিন সাধারণ জনগণ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে এটি প্রমাণ করা যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের শর্তের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করছে না।

 

অর্থাৎ, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে তারপর আলোচনার টেবিলে বসলে তা মার্কিন প্রশাসনের রাজনৈতিক পতন বা পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে না, বরং তা কৌশলগত সাফল্য হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

 

এমন রাজনৈতিক নাটকীয়তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতকে শান্ত রাখতেই সাহায্য করবে না, বরং রিপাবলিকান পার্টিকে একটি শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ করে দেবে।

 

রাজনৈতিক এই গভীর সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিকল্প আরেকটি কৌশলগত সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তাঁর মতে, ইরান সংকট নিরসনে মার্কিন রাজনীতিতে দ্বিদলীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলকেও শান্তিপত্র বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার একটি পথ খোলা থাকতে পারে।

 

যদি ইরান সংক্রান্ত সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের পূর্ণ দায়ভার কেবল রিপাবলিকানদের ওপর না রেখে আলোচনার টেবিলে ডেমোক্র্যাটদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে অংশীদার করা যায়, তবে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা নেতিবাচক ফলাফলের একক দায়ভার ট্রাম্প প্রশাসনকে বহন করতে হবে না।

 

সার্বিক দায়ভার দুটি প্রধান দলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন হয়ে গেলে তা রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সৃষ্টি হতে যাওয়া যেকোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝড় মোকাবিলা করা হোয়াইট হাউসের জন্য অনেক বেশি সহজতর হবে।

 

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসনের সময়সীমা সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে দেওয়া নিজের সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে ইরানের সাথে কোনো প্রকার স্থায়ী চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

 

ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত প্রতীয়মান হয় যে, নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ দলের রক্ষণশীল ভোটারদের অসন্তুষ্ট করতে তিনি একেবারেই রাজি নন। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এক প্রকার স্থবির বা ধীরগতির থাকার সম্ভাবনাই বেশি, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি সময় ধরে ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে রাখবে।

 

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মাঝেই ইরানের বেসামরিক কূটনীতিকেরা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ শান্তি প্রস্তাব জমা দিয়েছেন।

 

ওই প্রস্তাবে মূলত সাত দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তীতে সমগ্র সংকট নিরসনের জন্য একটি সার্বিক কূটনৈতিক পথনকশা তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিশ্লেষক পল মাসগ্রেভের মতে, ইরানের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা গ্রহণ করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ও জটিল এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কারণ, নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ইরানের পক্ষ থেকে আসা এ ধরনের প্রস্তাব হুট করে গ্রহণ করলে তা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নমনীয়তা বা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিত্রিত হতে পারে, যা তাঁর বিরোধীপক্ষ সহজেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

 

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের উত্থাপিত সাম্প্রতিক প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনকে এমন একটি অস্বস্তিকর ও কৌশলগত অবস্থানের মুখোমুখি করেছে, যা বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি গ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

 

এর ফলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক সম্পর্কের রাজনৈতিক ভবিষ্যতই নির্ধারণ করবে না, বরং সমগ্র বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের চূড়ান্ত পরিণতি কী দাঁড়ায়, তা দেখার জন্য এখন পুরো বিশ্ব রাজনীতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে।

 

- আল জাজিরা