রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপ্রতিসম কৌশলে যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবেলার বার্তা দিল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

অপ্রতিসম কৌশলে যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবেলার বার্তা দিল ইরান
ছবি : Collected

পশ্চিম এশিয়ার বিদ্যমান ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ইরান তার প্রতিরক্ষা রূপরেখা ও সামরিক কৌশলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেছে।

 

দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফাজল শেকারচি এক বিশেষ সামরিক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহিরাগত শক্তির যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য আগ্রাসন নস্যাৎ করতে প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।

 

এ লক্ষ্যে দেশটি কোনো প্রথাগত বা পুরোনো যুদ্ধকৌশলের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের উদ্ভাবিত নতুন সামরিক প্রযুক্তি এবং গোপন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক বিশেষ সংবাদ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সিনিয়র এই সামরিক কর্মকর্তা প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সামরিক পরিকল্পনাকারীদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, শত্রুদের অগোচরে ইরানের কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক 'চমক' রক্ষিত রয়েছে, যা উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতিতে সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে জেনারেল শেকারচির এই বক্তব্য মূলত ইরানের আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং প্রতিরোধমূলক দূরদর্শিতার এক প্রফেশনাল ও সুনির্দিষ্ট বার্তা।

 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের গতিপথ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেকারচি উল্লেখ করেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন হলো প্রথাগত বা সনাতন যুদ্ধব্যবস্থা থেকে অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলে (অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার) সফল উত্তরণ।

 

সামরিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রচলিত আধুনিক যুদ্ধপদ্ধতিগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, বিশাল বাজেটনির্ভর এবং ভারী সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের বিপুল ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপ্রতিসম কৌশল ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সামনে মারাত্মকভাবে দুর্বল প্রমাণিত হয়েছে।

 

শেকারচি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বলেন, অপ্রতিসম যুদ্ধের মূল দর্শন হলো প্রতিপক্ষের কোটি কোটি ডলার মূল্যের জটিল ও ভারী অস্ত্রব্যবস্থার বিপরীতে সামরিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর, পরিচালনায় সহজ এবং তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল নিজস্ব প্রযুক্তি মোতায়েন করা।

 

এই কৌশলের ফলে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে অতি সহজে প্রতিপক্ষের বড় ধরনের আক্রমণ ভণ্ডুল করে দেওয়া সম্ভব হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের এই আত্মরক্ষামূলক সামরিক দর্শনের সাফল্য কেবল যান্ত্রিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি বাহিনীর সদস্যদের সুদৃঢ় আত্মত্যাগ, জাতীয় একতা এবং গভীর বিশ্বাসের এক সুসংহত রূপ।

 

বিগত কয়েক দশকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোনের প্রযুক্তিতে ইরান যে অভাবনীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পেছনের ঐতিহাসিক ভিত্তি স্মরণ করেন জেনারেল শেকারচি।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের স্বনির্ভরতার অন্যতম স্থপতি প্রয়াত বিশিষ্ট সামরিক প্রকৌশলী ও দূরদর্শী কমান্ডার হাসান তেহরানি মোকাদ্দামের অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধরেন।

 

তেহরানি মোকাদ্দামের নিরলস বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের কারণেই বহিঃস্থ প্রযুক্তিনির্ভরতা পুরোপুরি দূর করে সম্পূর্ণ দেশীয় শিল্প-প্রযুক্তিতে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছিল ইরান।

 

শেকারচির মতে, আজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা যে উৎকর্ষে পৌঁছেছে, তা শত্রুপক্ষের সামরিক গণনাকারীদের সমীকরণ পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। তথ্যের চরম গোপনীয়তা ও সামরিক নিরাপত্তার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, যেকোনো আধুনিক যুদ্ধে আকস্মিকতার কৌশলগত উপাদান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

 

ইরান সব সময় নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক উদ্ভাবনের তথ্য গোপন রাখাকে অগ্রাধিকার দেয়, যার ফলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের আসল সামর্থ্য সম্পর্কে প্রতিনিয়ত ভুল হিসাব-নিকাশ করে আসছে।

 

তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষগুলোর যদি নূন্যতম কৌশলগত বাস্তবতা অনুধাবন করার বোধশক্তি থাকত, তবে তারা কখনো ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি সৃষ্টি করত না।

 

বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম মূল ধমনী হিসেবে পরিচিত পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালির ওপর আন্তর্জাতিক জলসীমার সার্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন সশস্ত্র বাহিনীর এই মুখপাত্র।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানের উপকূল সংলগ্ন ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন এই পানিপথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক ও সামরিক জলযানকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন এবং তেহরান নির্ধারিত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা রূপরেখা পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।

 

এই রূপরেখার বাইরে গিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পারস্য উপসাগরে বিচরণ করার চেষ্টা করলে কোনো জাহাজকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না। একই সাথে অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপর তীব্র বিরোধিতা করেন জেনারেল শেকারচি।

 

তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের অবাস্তব স্বপ্ন পরিত্যাগ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উসকানি ও সামরিক উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে সমগ্র হরমুজ প্রণালির সার্বিক নৌ-নিয়ন্ত্রণ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হস্তগত রয়েছে।

 

তেহরানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি বা তদারকি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক নৌযানই এই পানিপথ সম্পূর্ণ নিরাপদে অতিক্রম করার নিশ্চয়তা পাবে না। মার্কিন হস্তক্ষেপের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে ইরানের নৌবাহিনী চপেটাঘাতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত সামুদ্রিক জবাব দেবে বলে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেন তিনি।

 

পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র বাস্তবমুখী সমাধান বলে চিহ্নিত করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফাজল শেকারচি।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক মোতায়েন কখনোই নিরাপত্তা আনয়ন করেনি, বরং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধ বিগ্রহকে উসকে দিয়েছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যায়, বিদেশি মার্কিন বাহিনীকে এই অঞ্চল ত্যাগ করে চলে যাওয়া ছাড়া রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অন্য কোনো ফলপ্রসূ বিকল্প অবশিষ্ট নেই। শেকারচি উল্লেখ করেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি যত দ্রুত এই ভূখণ্ড ত্যাগ করবে, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তিকামী সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত কম হবে।

 

পশ্চিমা শক্তির অনুপস্থিতিতে অঞ্চলের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং যৌথ নিরাপত্তা জোরদারকরণের মাধ্যমেই এই এলাকা নিশ্চিতভাবে একটি স্থায়ী নিরাপদ ও সংঘাতমুক্ত অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

 

যুদ্ধক্ষেত্র বা আঞ্চলিক সশস্ত্র উত্তেজনার অবসান ঘটলেও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার দায় থেকে আন্তর্জাতিক উসকানদাতারা পার পাবেন না বলে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেকারচি। তিনি বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

 

শেকারচি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সামরিক বা রাজনৈতিক টানাপোড়েন একসময় থেমে যেতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে অবৈধ আক্রমণ পরিচালনা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দায়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে আইনানুভেগে উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি করার কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি প্রয়াস অব্যাহত রাখবে ইরান।

 

সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণ্ণকারী শক্তির প্রধানদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থেকে ইরান কোনো অবস্থাতেই পিছু হটবে না। সামগ্রিকভাবে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেকারচির এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভৌগোলিক সামরিক সমীকরণে ইরানের দৃঢ় অবস্থান ও নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর অপ্রতিসম রণকৌশলের কার্যকারিতাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুনরায় সুস্পষ্ট করে তুলেছে।

 

- পার্সটুডে