সম্প্রতি মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের পরিবেশিত প্রতিবেদনে এই কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে যে, কৌশলগত এই জলপথটি উন্মুক্ত করার বিষয়ে প্রণীত সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে তেহরান এই নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করলেও এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সাড়ার ওপর।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই প্রস্তাব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে এবং তাদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি ও শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করে, তবে ইরানও তার পূর্বঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় কোনো জটিলতা বা বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। বর্তমান এই জটিল ও সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সুরাহা করার জন্য তেহরান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য এবং কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গঠন করা হয়েছে।
দেশের সামরিক বাহিনী, জাতীয় সংসদ তথা পার্লামেন্ট এবং সরকারের নীতিনির্ধারক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার অভিজ্ঞ ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই বিশেষ দলটি গঠিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত আলোচনা ও কূটনৈতিক দেনদরবারে এই দলটি এখন তেহরানের পক্ষ থেকে মূল ভূমিকা পালন করছে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
গত প্রায় সাত মাস ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে যে বহুমুখী ও তীব্র সংঘাতের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই কৌশলগত হরমুজ প্রণালি।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে, যার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার তাগিদেই মূলত এই জলপথটি সচল করার বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে তেহরানের পক্ষ থেকে এই নতুন পরিকল্পনা পেশ করা হলো, যা উভয় দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করতে একটি নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর এই নতুন পরিকল্পনাটিতে যে সমস্ত শর্ত ও প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে চলতি বছরের জুনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলোর এক ধরনের চমৎকার মিল রয়েছে।
ওই সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত বিভিন্ন বিষয়ের আলোকেই বর্তমানের এই নতুন রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিকভাবে জব্দ করে রাখা ইরানের নিজস্ব সম্পদ থেকে অন্তত ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবিলম্বে অবমুক্ত করা এবং ছাড় করা।
এ ছাড়াও বিশ্ববাজারে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত মার্কিন একতরফা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ওপর বলবৎ থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক অবরোধের অবসান ঘটানোর সুনির্দিষ্ট দাবিও এই নতুন পরিকল্পনায় জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পথ নিয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে এমন একটি যুগান্তকারী ও নমনীয় প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
হোয়াইট হাউজ এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই বিষয়ে কৌশলগত নীরবতা বজায় রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নতুন পরিকল্পনাটির প্রতি খুব একটা অনুকূল মনোভাব প্রদর্শন করেননি এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাবটি একরকম প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তা সত্ত্বেও ইরানের এই সর্বাত্মক শান্তি ও সহযোগিতার নতুন পরিকল্পনাটিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সকল ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড এবং সামরিক উত্তেজনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও যুক্ত করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতির গবেষক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনের এই কূটনৈতিক উদ্যোগটি যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনাকেই প্রশমিত করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহের সাপ্লাই চেইনকে স্থিতিশীল করতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই বিষয়ে সরাসরি সমর্থন এবং সুনির্দিষ্ট দল গঠনের মাধ্যমে তেহরান যে আলোচনার টেবিলে নিজেদের সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আনতে পারে।
এখন সমস্ত দৃষ্টি মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।