মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্য অচল করার চরম হুঁশিয়ারি গালিবাফের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্য অচল করার চরম হুঁশিয়ারি গালিবাফের
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে এক নজিরবিহীন ও চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরান যদি নিজের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিশ্ববাজারে রপ্তানি করতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশকেও তেল বিক্রি বা পরিবহন করতে দেওয়া হবে না।

 

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে তিনি তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থানের কথা পুনরুল্লেখ করেন। গালিবাফের এই কঠোর হুমকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন গভীর উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তেহরানের এই স্পষ্ট ঘোষণা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে তাদের চরম প্রতিঘাতের কৌশলেরই বহুমাত্রিক প্রকাশ।

 

তেহরানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত এই বিশেষ বক্তব্যে স্পিকার গালিবাফ অত্যন্ত কঠোর শব্দ চয়নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, যে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ইরানের জ্বালানি তেল বিক্রির স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করা হবে, সেই অঞ্চল থেকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য তেল রপ্তানির সুবর্ণ সুযোগ খোলা রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

 

নিজের বক্তব্যের সমর্থনে অত্যন্ত শক্ত যুক্তি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, তেহরানের জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি আন্তর্জাতিক বলপ্রয়োগ ও শত্রুভাবাপন্ন আচরণের মাধ্যমে বিঘ্নিত হয়, তবে সমগ্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো রাষ্ট্রেরই জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিরাপদ থাকবে না।

 

ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব যৌথভাবে এই নীতি প্রণয়ন করেছে বলে উল্লেখ করে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে সতর্ক করে দেন যে, ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় আঘাত হানার প্রতিক্রিয়া কেবল তেহরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থাকে নিমেষেই অচল করে দিতে পারে।

 

ভৌগোলিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত 'হরমুজ প্রণালী' বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বৈশ্বিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশের বেশি অংশ প্রতি দিন এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে।

 

এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথটির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান, যা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল সুবিধাজনক অবস্থান প্রদান করে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক এবং কাতারের মতো দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিশাল আকৃতির তেলের ট্যাংকারগুলো এই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেই বিশ্ববাজারে তাদের জ্বালানি পণ্য পৌঁছে দেয়।

 

ফলে, ইরান যদি বাস্তবিকই এই অঞ্চলে যেকোনো কূটনৈতিক বা সামরিক উপায়ে তেল পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে মারাত্মক জ্বালানি সংকট দেখা দেবে। এই বিশ্ববাস্তবতাকে সামনে রেখেই গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তেহরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখা একেবারেই অসম্ভব হবে।

 

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে গভীরভাবে নজর দিলে দেখা যায়, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রবীণ নীতিনির্ধারক। তিনি সাবেক ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-এর একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার হিসেবেও দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

ফলে তাঁর এই জাতীয় সামরিক শক্তিসংক্রান্ত সরাসরি বক্তব্য কেবল একজন সংসদীয় স্পিকারের ব্যক্তিগত মত বা বক্তব্য নয়, বরং এটি ইরানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির যৌথ রাজনৈতিক সঙ্কল্পের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তেহরানের বিরুদ্ধে অব্যাহত কঠিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতগুলোর তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান তাদের সামগ্রিক সামরিক প্রতিরোধ কৌশলকে আরও আগ্রাসী ও প্রত্যক্ষ রূপ দান করছে।

 

তেহরানের বার্তাটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব পরিষ্কারভাবে পৌঁছে গেছে-ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা পঙ্গু করার কোনো চেষ্টা চালানো হলে, তার চূড়ান্ত মাশুল পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এবং এর সাথে সংযুক্ত বিশ্ব অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহকেও প্রদান করতে হবে।

 

গালিবাফের এই নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর নীতি-নির্ধারণী মহলে চরম অস্বস্তি ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। রিয়াদ, আবুধাবি এবং মানামার মতো রাজধানীগুলোতে পারস্য উপসাগরের বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ ও কূটনৈতিক তৎপরতা।

 

মূলত সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি তাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছিল। কিন্তু ইরানের তরফ থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার সংকেত মেলার ফলে তাদের তেল উৎপাদন কেন্দ্র ও সামুদ্রিক জলপথের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

 

একই সাথে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশেষ নৌবহরের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে মুক্ত বাণিজ্য ও অবাধ সামরিক জাহাজ চলাচলের যে নিশ্চয়তা দিয়ে আসছিল, তা এই জাতীয় আঞ্চলিক বৈরী পরিস্থিতির মুখে কতটা কার্যকরী থাকবে-তা নিয়েও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্রই এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক সংঘাত চায় না, তবে ইরানের এই অনমনীয় ঘোষণা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে একটি কঠিন নিরাপত্তা সমীকরণের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজার এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সামান্যতম রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতাও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্পিকার গালিবাফের ক্ষুরধার বক্তব্যের পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের সম্ভাব্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তা উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় বিশ্বের জন্য মূল্যস্ফীতির হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

 

যদি বাস্তবে এই অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ সাময়িকভাবেও বন্ধ হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে যাবে, যা বৈশ্বিক পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

 

এটি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে থমকে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী করে তুলবে। ইরান মূলত এই কৌশলগত, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বৈরী নীতি পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে।

 

সামগ্রিক আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত পরিহার করে টেকসই শান্তি বজায় রাখা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ বিষয় নয়, এটি সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

 

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের এই কঠোর ও ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক সংকটের আগাম সূচনা করছে। বিশ্ব সংস্থাসমূহ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো যদি অবিলম্বে কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক কড়াকড়ির কোনো সুষম ও সম্মানজনক সমাধান না খুঁজে পায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রকাশ্য হুমকি একটি চরম আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

 

পশ্চিম এশিয়ায় একটি নতুন রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রাখতে এখন সর্বস্তরের বিশ্বনেতাদের অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।