সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার প্রস্তুতি নেতানিয়াহুর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম

এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার প্রস্তুতি নেতানিয়াহুর
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং নজিরবিহীন উত্তেজনার জন্ম দিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বা আইসিসিতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

 

বিশ্বের দুই প্রতাপশালী নেতার মধ্যকার এই আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বৈরী সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার প্রশাসনের একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় দল এবং আন্তর্জাতিক আইন বিভাগকে এই আইনি প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও নিখুঁতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।

 

এই বিশেষ আইনি দলের মূল কাজ হবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুরস্কের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করার আইনি পথ খুঁজে বের করা।

 

প্রস্তাবিত এই আন্তর্জাতিক মামলার মূল ভিত্তি হিসেবে দু’টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর অভিযোগকে সামনে নিয়ে এসেছে ইসরায়েল প্রশাসন। প্রথমত, তুরস্কের অভ্যন্তরে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত কুর্দি সংখ্যালঘুদের ওপর এরদোয়ান সরকারের কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিপীড়নের অভিযোগটিকে এই মামলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে তেল আবিব।

 

কুর্দি ইস্যুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বরাবরই একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইসরায়েল এখন এই আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এরদোয়ানকে বিশ্ব দরবারে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছে।

 

দ্বিতীয়ত, তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক আর্থিক সহায়তা প্রদানের অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের একাংশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে তুরস্ক প্রায়শই তাদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করে থাকে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই আকস্মিক আইনি পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে তুরস্কের সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত আগ্রাসী কূটনৈতিক ঘোষণা।

 

সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের শরণাপন্ন হবেন এবং আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন।

 

এরদোয়ানের এমন অভাবনীয় ও কড়া ঘোষণার পর থেকেই মূলত ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। সেই চরম বৈরী ও সংঘাতময় পরিবেশের ঠিক পরপরই ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই পাল্টা মামলা দায়েরের হুঁশিয়ারি এল, যা মূলত এক ধরনের প্রতিশোধমূলক কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

এই চরম বৈরী পরিবেশের সূত্রপাত মূলত গত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ঘটা একটি ঐতিহাসিক আইনি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান চলাকালে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার হামলা, কথিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী গুরুতর অপরাধ সংঘটনের সুস্পষ্ট অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি।

 

আইসিসির সেই ঐতিহাসিক রায়ের পর থেকেই নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক চলাফেরা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ওপর প্রবল কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

 

তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতানিয়াহুর এই পাল্টা মামলার হুমকির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত 'রোম সংবিধি' বা রোম স্ট্যাটিউট-এ ইসরায়েল কিংবা তুরস্ক-কোনো দেশই আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেনি।

 

চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র না হওয়ায় এই দুটি দেশের কোনোটির ওপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সরাসরি বা স্বয়ংক্রিয় কোনো বিচারিক এখতিয়ার নেই। সুতরাং স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় আইসিসিতে সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার কোনো সুযোগ তাদের আইনি কাঠামোতে নেই।

 

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরাসরি বিচারিক এখতিয়ার না থাকলেও তাত্ত্বিক দিক থেকে ইসরায়েল চাইলে অন্য কোনো বিকল্প পথ বা তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যম ব্যবহার করে আইসিসিতে এই মামলা দায়েরের পথ খুঁজে নিতে পারে।

 

সে ক্ষেত্রে এমন কোনো দেশকে বাদী হিসেবে সামনে আনা হতে পারে, যারা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী সদস্য এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজের উচ্চপদস্থ সরকারি সূত্রগুলো অবশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ইসরায়েল সরকার বাস্তবে সত্যিই যে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আইসিসিতে চূড়ান্ত মামলা দায়ের করবে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

 

বরং এই পুরো আইনি প্রস্তুতি ও ব্যাপক তোড়জোড়কে তারা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির সুকৌশলী হাতিয়ার বা 'ডিটারেন্স' হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মূল লক্ষ্য হলো, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলকে ব্যবহার করার যে উদ্যোগ এরদোয়ান নিয়েছেন, তার বিপরীতে একটি পাল্টা শক্তিশালী হুমকি তৈরি করে তাকে সেই পথ থেকে নিবৃত্ত বা নিরস্ত করা।

 

এটি মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতির সেই চিরায়ত কৌশল, যেখানে আইনি ব্যবস্থাকে ঢাল এবং তলোয়ার উভয় হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ইসরায়েল এবং তুরস্কের মধ্যকার একসময়ের কৌশলগত মিত্রতা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও তিক্ত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে।

 

ভূরাজনৈতিক এই স্নায়ুযুদ্ধ কেবল দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অহংবোধের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

 

এরদোয়ানের পদক্ষেপের জবাবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এই পাল্টা আইনি ব্যবস্থার পথে এগোনোর ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, তা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক কূটনীতির ময়দানে আরও অনেক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

- আই২৪ নিউজ