সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই দফা বিমান হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন মোজতবা খামেনি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

দুই দফা বিমান হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন মোজতবা খামেনি
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অত্যন্ত উত্তাল, সংঘাতময় ও জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক রোমাঞ্চকর, চাঞ্চল্যকর এবং নজিরবিহীন তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরাইলের যৌথ সামরিক বাহিনীর কঠোর আগ্রাসী অভিযানের অংশ হিসেবে পরিচালিত ধারাবাহিক বিমান হামলার মুখে পড়েও জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে দুবার অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি।

 

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত কাতারভিত্তিক একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল, গোপনীয় ও নাটকীয় তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন ইরানের নীতিনির্ধারণী ও ধর্মীয় সংস্থা এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলির বিশিষ্ট এবং সম্মানিত সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহসেন হেইদারি আলে কাসির।

 

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি কেবল তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশেও এক নতুন ও গভীর মাত্রা যোগ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই রোমাঞ্চকর ও মর্মান্তিক ঘটনার সম্পূর্ণ সূত্রপাত ঘটে মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সে সময় মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ সামরিক বাহিনী তাদের পূর্বনির্ধারিত এবং অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক আগ্রাসী অভিযানের অংশ হিসেবে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সুরক্ষিত সরকারি বাসভবনকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আকস্মিক ও শক্তিশালী বিমান হামলা পরিচালনা করে।

 

পূর্ব কোনো বড় ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই চালানো ওই ভয়াবহ বিমান হামলায় বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার সম্মানিত পিতা এবং তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত বেঁচে গেলেও মোজতবা খামেনি মারাত্মকভাবে জখম ও আহত হন।

 

দ্রুত জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানী তেহরানের একটি বিশেষায়িত, আধুনিক ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল ও সংকটজনক ছিল বলে কূটনৈতিক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছিল।

 

কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাতের চরম তীব্রতা এবং নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন সামরিক বাহিনী অমানবিকতার চূড়ান্ত পরিচয় দিয়ে পরবর্তীতে ওই চিকিৎসাকেন্দ্রটিকেও তাদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং সেখানে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বোমা হামলা চালায়।

 

দ্বিতীয় দফার এই বিধ্বংসী ও প্রচণ্ড শক্তিশালী হামলায় চিকিৎসাকেন্দ্রটির ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও তিনি সেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকেই অলৌকিকভাবে অক্ষতপ্রায় শরীরে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে আসেন।

 

হাসপাতালের ওপর চালানো ওই দ্বিতীয় দফার ভয়াবহ বিমান হামলার অব্যবহিত পরেই বিশ্বস্ত নিরাপত্তা কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তাকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তেহরানের ওই বিপদসংকুল এলাকা থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও নিরাপদ একটি স্থানে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

 

সেই ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জনসমক্ষ থেকে সম্পূর্ণ দূরে, পর্দার আড়ালে এবং সম্পূর্ণ আত্মগোপনের অবস্থায় জীবনযাপন করে চলেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও চরম গোপনীয়তার কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে তাঁর শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা, সংশয় ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছিল।

 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্ট সরকারিভাবে দাবি করেছেন যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন এবং তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা যেকোনো ধরনের বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রয়েছে।

 

তা সত্ত্বেও এই চাঞ্চল্যকর ও অবিশ্বাস্য তথ্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, একের পর এক জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবেলা করে এবং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন হওয়া এই নেতার জীবনযাত্রা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক অবিশ্বাস্য ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে।

 

এদিকে দেশের এই চরম ক্রান্তিকালীন ও জটিল মুহূর্তে নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে নিজের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হওয়ার আগে মোজতবা খামেনি নিজে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অন্ধ অন্ধকারে ছিলেন বলে ওই ধর্মীয় বক্তা তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

 

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও সাংবিধানিক পরিষদ হিসেবে পরিচিত এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলির সম্মানিত সদস্যদের মোট ঊনষাটটি গোপন ভোটের মধ্যে তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে এবং নিরঙ্কুশ সমর্থন অর্জন করে পঞ্চাশটি অত্যন্ত মূল্যবান ভোট লাভ করেন এবং দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার এই গুরুদায়িত্ব ও ঐতিহাসিক পবিত্র আমানত নিজের কাঁধে তুলে নেন।

 

তৎকালীন চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র সামরিক আতঙ্ক এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহের মাঝেও এই ভোটগ্রহণ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন করা হয়েছিল, যা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ধারাবাহিকতা এবং শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

 

বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে জীবনের সঙ্গে চরম লড়াই করার পর এবং পরবর্তীতে গভীর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় এমন একটি ঐতিহাসিক ও জটিল রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহল, বিস্ময় ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

এই অভূতপূর্ব এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঠিক এমন একটি সময়ে বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ পেল, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক জোট এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত একটি চরম, সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে।

 

একের পর এক মারাত্মক সামরিক বিমান হামলা, কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তীব্র কূটনৈতিক বৈরিতার মাঝেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের এই অলৌকিক বেঁচে থাকা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অটুট টিকে থাকার বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে নতুনভাবে বিশ্ববাসীর সামনে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

যদিও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং পশ্চিমা প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো এই ঘটনার শতভাগ সত্যতা ও এর পারিপার্শ্বিক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে, তবুও তেহরানের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণের কাছে এটি অভ্যন্তরীণ মনোবল চাঙ্গা রাখার এবং বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অটল থাকার এক বিশাল ও ঐতিহাসিক উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

পরিশেষে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মতো মারাত্মক মৃত্যুর মুখ থেকে দুবার অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে এসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই সিংহাসনে ঐতিহাসিক আরোহণ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর, রক্তক্ষয়ী ও অবিশ্বাস্য এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।

 

- এনডিটিভি