মার্কিন প্রশাসনের দাবি, আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার পূর্বশর্ত হিসেবে তেহরান মার্কিন নৌঘাঁটিসমূহের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়ার মতো বেশ কিছু অতিরিক্ত ও অগ্রহণযোগ্য ছাড়ের দাবি জানিয়েছে।
আর এই অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত শর্তগুলোর কারণেই ওয়াশিংটন তেহরানের এই শান্তিপ্রস্তাব এক বাক্যে নাকচ করে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউসের কূটনৈতিক সূত্র। মধ্যপ্রাচ্যের জলবায়ু ও যুদ্ধক্ষেত্রের চলমান বাস্তবতায় এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা সমগ্র অঞ্চলটিকে আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান যে, মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের মনে এই গভীর অনাস্থা কাজ করছে যে, তেহরান কখনোই তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের কথা রক্ষা করবে না।
মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি প্রকৃত অর্থে কোনো সৎ কূটনৈতিক সমঝোতার প্রয়াস ছিল না; বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অনুকূলে একটি অগ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতদুষ্ট শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার অত্যন্ত চতুর একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করে দাবি করেছেন যে, তেহরান বর্তমানে এই শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে কেবল এই কারণে যে তারা চলমান সামরিক সংঘাতে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে হেরে যাচ্ছে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র তুলে ধরে গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনের ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন। ওই প্রস্তাবে তেহরানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল।
যার মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবিগুলো ছিল আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অবরুদ্ধ থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদ অবিলম্বে অবমুক্ত করা, দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা খ্যাত তেল রপ্তানির ওপর থেকে সমস্ত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর সামরিক অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া।
তেহরানের যুক্তি ছিল, এই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা না হলে কোনো টেকসই আঞ্চলিক শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভবপর নয় এবং সার্বভৌম দেশ হিসেবে ইরান তাদের নিজস্ব আত্মরক্ষার ও সমুদ্রপথ ব্যবহারের অধিকার ছাড় দিতে পারে না।
তবে মার্কিন কূটনীতিকরা ইরানের এই উচ্চাভিলাষী দাবিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অতিরিক্ত শর্তযুক্ত ও অযৌক্তিক হিসেবে অভিহিত করে তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন কঠোর অবস্থানের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে পুরোনো ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, নির্দিষ্ট কিছু পারস্পরিক শর্ত ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই কেবল তেহরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার কথা বিবেচনা করতে পারে, যা তাদের মতে তাদের অবিসংবাদিত ন্যায্য অধিকার।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের বিগত দুই বছরের কর্মকাণ্ড ও শত্রুভাবাপন্ন আচরণে তীব্র হতাশা প্রকাশ করে তিনি বিশ্বমঞ্চে কূটনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তেহরান মনে করে, ওয়াশিংটন সদিচ্ছা না দেখিয়ে কেবল চাপ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেছে, যা কোনোভাবেই একটি স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারে না।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই শান্তিপ্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তেহরানের বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পুনরায় পূর্ণমাত্রায় বিমান হামলা চালানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে।
তবে একদিকে সামরিক শক্তির মহড়া ও হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনার দুয়ার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেননি। বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী সপ্তাহেই হয়তো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পুনরায় পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে।
ট্রাম্পের স্পষ্ট কথা হলো, ইরান একটি চুক্তি করতে বা সমঝোতায় পৌঁছাতে অবশ্যই চাইছে, কিন্তু সেই চুক্তিটি এমন হওয়া উচিত নয় যা ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী বা যা তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে করতে চান।
ইরানের বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের বর্তমান ভঙ্গুর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছেন বলেও তিনি তীব্র তিরস্কারমূলক মন্তব্য করেছেন। এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে সম্ভাব্য পরোক্ষ আলোচনা সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই শুরু হতে পারে।
একদিকে সামরিক সংঘাতের তীব্র হুমকি এবং অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চলমান এই পরোক্ষ কূটনীতির দোলাচলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
একদিকে ওয়াশিংটনের কড়া অবস্থান এবং অন্যদিকে তেহরানের নাছোড়বান্দা শর্তযুক্ত মনোভাবের কারণে চলমান এই কূটনৈতিক অচলায়বস্থা দ্রুত নিরসন না হলে হরমুজ প্রণালিসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও বেশি বিপজ্জনক রূপ ধারণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারী এবং বিশ্বনেতৃবৃন্দ এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের তাগিদ দিয়ে গেলেও দুই পরাশক্তি ও আঞ্চলিক দেশের অনড় মনোভাব সেই প্রচেষ্টাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক বাকবিতণ্ডা এবং ক্ষমতার লড়াই কোন চূড়ান্ত পরিণতিতে গিয়ে ঠেকে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির গবেষক ও বিশ্ববাসীর।