মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-আলামের এক সংবাদদাতার সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পার্সটুডে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলগত অবস্থান মূল্যায়ন করে ইরানের শীর্ষ এই সামরিক কর্মকর্তা দেশের প্রতিরক্ষা নীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে স্পষ্ট করেছেন।
সাক্ষাৎকারে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে নিয়মিতভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সত্যি সত্যিই সর্বাত্মক কোনো যুদ্ধ শুরু হবে কি না-এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধবিরতির সময়কালটিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কৌশলগত প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে, সামরিক সরঞ্জামগুলোর কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে, নতুন ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র যুদ্ধ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং বিগত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও রণকৌশলগুলোকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া দাবি করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান বর্তমানে মোটেও অনুকূল বা শক্তিশালী নয়। তার ভাষ্যমতে, এ অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইতোমধ্যে মারাত্মক ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত আকাশচিত্র, বিভিন্ন তথ্যচিত্র এবং মাটিতে সরাসরি সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের কাছে এই ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ইরানের কাছে থাকা নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন ঘাঁটিগুলোর একটি বড় অংশ এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগই এখন আর পুনরায় আগের মতো পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
এই ব্যাপক অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সার্বিক রসদ সরবরাহ এবং লজিস্টিক সহায়তা ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি আরও জানান যে, এই পরিস্থিতির কারণে মার্কিন সেনাদের জন্য জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও এখন অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং তা দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব না হওয়ায় পুরো মার্কিন কমান্ডের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে।
এর ফলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মাইল দূরবর্তী পূর্ব এশিয়া এবং দিয়েগো গার্সিয়ার মতো দূরবর্তী ঘাঁটিগুলো থেকে বিকল্প উপায়ে রসদ সরবরাহের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক প্রশাসনের জন্য মারাত্মক ভোগান্তি ও বাড়তি অসুবিধার সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন সেনাদের মানসিক অবস্থা ও মনোবলের অবনতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, চরম হতাশা ও চাপের মুখে কিছু মার্কিন সেনা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে মার্কিন সেনাবহরের মানসিক স্থিতি সন্তোষজনক নয়।
মার্কিন প্রশাসনের সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন যে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মার্কিন নেতৃত্ব হয়তো নতুন কোনো উসকানিমূলক বা আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে বাস্তবতার নিরিখে তাদের কাছে এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঐতিহাসিক ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী পরিবর্তনগুলোর কথা উল্লেখ করে জেনারেল আকরামিনিয়া জানান যে, আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার ব্যতিরেকে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ হলেও, ওই যুদ্ধের পর ইরান তাদের সামরিক মতবাদে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।
শহীদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ আবদোলরহিম মুসাভি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ইরানের সামরিক মতবাদকে রক্ষণাত্মক কৌশল থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে রূপান্তর করার কাজটি ত্বরান্বিত করেছিলেন, যা তারা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত সফলভাবে কার্যকর করেছেন।
এই আক্রমণাত্মক কৌশলের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান যে, এর অংশ হিসেবে তারা সম্প্রতি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে সক্রিয় বিপ্লববিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানাগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সফল আক্রমণ পরিচালনা করেছেন।
মার্কিন রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ ঘোষণায় এই বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইরানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল, যাতে একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য হামলার পাশাপাশি ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় স্থলসীমান্তেও বহুমুখী আক্রমণ চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করা যায়।
কিন্তু ইরানের আগাম সামরিক কৌশলের কারণে শত্রু পক্ষ সেই সুযোগ পায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এটি মূলত একটি সফল আগাম যুদ্ধের নিখুঁত উদাহরণ, যেখানে শত্রু পক্ষ চূড়ান্ত আগ্রাসন চালানোর আগেই তাদের কোণঠাসা করা হয়েছে।
আর এর ফলস্বরূপ আজ পর্যন্ত দেশের বিপ্লববিরোধীরা ইরানের মূল স্থলসীমান্তের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বড় ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করার ন্যূনতম সাহস বা সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।