ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো বর্তমানে প্রণালির মুখ থেকে অন্তত ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের প্রভাব ও সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত বুধবার এক বিশেষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বিস্তারিতভাবে জানান যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে বিগত কয়েক মাস ধরে যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জেনারেল মোহেব্বি তার বিবৃতিতে স্মরণ করিয়ে দেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রথম সূচনা হয়, তখন এই হরমুজ প্রণালি এবং এর নিকটবর্তী জলসীমায় নিয়মিতভাবে ৩০ থেকে ৪০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সর্বক্ষণ টহল দিত।
তাদের এই সামরিক উপস্থিতি ছিল এই অঞ্চলের নিত্যদিনের চিত্র এবং একধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকির বার্তা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দৃশ্যপটে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই অত্যন্ত কৌশলগত বাণিজ্যিক জলপথে কিংবা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে বর্তমানে একটিও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
মার্কিন নৌবাহিনীর এই আকস্মিক পশ্চাদপসরণ ও কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক কৌশল ও সক্ষমতার তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক হুমকিগুলোকে নিছক ফাঁকাবুলি আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান হুমকিগুলো আসলে একটি দৃশ্যমান পরাজয়কে বিশ্বের সামনে বিজয় হিসেবে তুলে ধরারই এক ব্যর্থ অপচেষ্টা মাত্র।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন একটি নাজুক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে তাদের পক্ষে আর এই অঞ্চলে একচেটিয়া সামরিক আধিপত্য ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন যে, একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে ধরনের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা, বিপুল অর্থনৈতিক সমর্থন এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমানে তার মারাত্মক অভাব রয়েছে।
মূলত নিজেদের সেই কাঠামোগত ও লজিস্টিক দুর্বলতা ঢাকতেই তারা যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে তেহরান মনে করে। হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ওয়াশিংটন পুনরায় নিজেদের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে বলে সম্প্রতি পেন্টাগনের পক্ষ থেকে যে জোরালো দাবি করা হচ্ছিল, তার প্রেক্ষিতে আইআরজিসির মুখপাত্রের এই বিবৃতি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য অটুট থাকার প্রমাণ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়েই ইরান বারবার তাদের সেই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে এবং বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে দাবি করছে।
জেনারেল মোহেব্বির এই বিবৃতি মূলত সেই চ্যালেঞ্জেরই একটি আনুষ্ঠানিক, তথ্যভিত্তিক এবং জোরালো বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে তেহরান বিশ্ববাসীকে এই সুনির্দিষ্ট বার্তাই দিতে চাইছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের দিন সম্ভবত চিরতরে শেষ হতে চলেছে।
এই সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সাধারণ সামুদ্রিক জলপথ নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হিসেবে স্বীকৃত।
মাত্র ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রধানতম করিডোর। ভৌগোলিক দিক থেকে এর একপাশে অবস্থান করছে ইরান এবং অপর পাশে রয়েছে ওমান। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই একটি মাত্র সরু প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী বিশাল সব বাণিজ্যিক ট্যাংকার এই পথ পাড়ি দিয়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে এই প্রণালিতে সামান্যতম অস্থিরতা বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার ক্ষমতা রাখে।
বর্তমান এই বহুমুখী উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের শুরুতে, যখন দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই ইরানের অভ্যন্তরে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে, যার প্রেক্ষিতে তেহরান অত্যন্ত দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়।
নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে এবং প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ অবরোধ জারি করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের চেন বা শৃঙ্খলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।
অন্যদিকে বসে থাকেনি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রও। তেহরানের এই অবরোধের পাল্টা ও কঠোর জবাব হিসেবে ওয়াশিংটনও কালক্ষেপণ না করে ইরানের প্রধান সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে কঠোর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং গোটা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়।
পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম এবং বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়, তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব নিয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান।
ইসলামাবাদের অত্যন্ত নিবিড় ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে যুদ্ধোন্মুখ উভয় পক্ষ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মত হয়। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের জটিল ও স্নায়ুক্ষয়ী দরকষাকষির পর অবশেষে গত ১৭ জুন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে সাময়িকভাবে হলেও গোটা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যুদ্ধের কালো মেঘ কেটে যায়। চুক্তিটির শর্ত অনুযায়ী ইরান তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি থেকে তাদের পূর্বঘোষিত অবরোধ তুলে নেয় এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করে দেয়।
একইভাবে মার্কিন নৌবাহিনীও সদিচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের সামরিক প্রহরা ও যাবতীয় অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। তবে আন্তর্জাতিক মহলের স্বস্তি খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
নানামুখী রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা, চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে মতবিরোধ এবং পারস্পরিক আস্থার চরম অভাবের কারণে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই শান্তিচুক্তিটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। গত ১৩ জুলাই এক আকস্মিক ও নাটকীয় ঘোষণায় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামাবাদ চুক্তি থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা জানায়।
শুধু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়াই নয়, একই সঙ্গে তেহরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে পুনরায় তাদের আগের সেই কঠোর অবরোধ জারি করে, যা পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও আগের মতো তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার নতুন করে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ে, যার প্রভাব এখনও চলমান রয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম জিও নিউজের নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে এই সার্বিক পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।