বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের নতুন প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিল যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

ইরানের নতুন প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিল যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বহুমুখী সামরিক সংঘাত এবং চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দীর্ঘ আট মাস ধরে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক সামরিক সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে তেহরানের দেওয়া একটি নতুন ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে ওয়াশিংটন প্রশাসন।

 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরানের উচ্চপদস্থ সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, তিনি এবং তার প্রশাসন ইরানিদের দেওয়া এই শান্তি প্রস্তাবটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

তবে সেই সময়ে তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছিল যে, তারা সংবাদমাধ্যমের খবরের বাইরে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত জবাব পায়নি। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রশাসন তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তেহরানের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

ইরানের বিরুদ্ধে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রধান আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েলের শুরু করা এই বহুমুখী সামরিক সংঘাতটি ইতোমধ্যে ধ্বংসযজ্ঞের সাত মাস পেরিয়ে আট মাসে পদার্পণ করতে চলেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ সংঘাতের ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এক চরম অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও গভীর মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অবিরাম অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল ও ভয়ংকর আকার ধারণ করছে। ঠিক এমন এক সংকটময়, যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহে তেহরান সংঘাত নিরসনে নতুন করে একটি ব্যাপকভিত্তিক শান্তি প্রস্তাব উত্থাপন করে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মূলত পূর্বে ভেস্তে যাওয়া একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে পুনর্জীবিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর লক্ষ্যেই ইরান নতুন করে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত ও শর্তসাপেক্ষ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের কাছে মূলত চারটি প্রধান শর্ত অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

প্রথমত, ইরানের পানিসীমা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে ও নিঃশর্তভাবে তুলে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা ব্যাংকে আটকে থাকা বা জব্দকৃত ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় অর্থ অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে, যাতে ইরান তা নিজেদের ধুকতে থাকা অর্থনীতিতে ব্যবহার করতে পারে।

 

তৃতীয়ত, সবকটি সামরিক ফ্রন্টে চলমান সমস্ত ধরনের সশস্ত্র লড়াই ও আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এবং চতুর্থত, ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি-জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর থেকে সকল প্রকার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

 

এই চার দফা কঠোর দাবির বিনিময়ে তেহরান একটি বড় ধরনের কৌশলগত ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই শর্তগুলো বাস্তবায়িত হলে, চুক্তি কার্যকরের মাত্র সাত দিনের মাথায় তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'হরমুজ প্রণালি' বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেবে।

 

হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে বিশাল ও অভূতপূর্ব সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল, ইরানের এই নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে তার একটি সম্ভাব্য ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ নির্দেশ করা হয়েছে।

 

বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এর বন্ধ থাকা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই তেহরানের এই শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাবটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, উচ্চপদস্থ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, ওয়াশিংটনের এই আনুষ্ঠানিক জবাবটি ইতোমধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির কার্যালয়ে এসে পৌঁছেছে।

 

অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন এই বার্তাটি হাতে পাওয়ার পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এই মার্কিন বার্তার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের পরবর্তী কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল নির্ধারণ করবেন বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

তবে ওই ইরানি সূত্রটি মার্কিন জবাবের অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে পুরোপুরি রাজি হয়েছে, নাকি এটি চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, অথবা প্রস্তাবের শর্তাবলি নিয়ে আরও কোনো গভীর আলোচনার পথ খোলা রেখেছে-সে বিষয়ে সূত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

এই অস্পষ্টতা ও তথ্য গোপনের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে চরম কৌতূহল ও জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এই আনুষ্ঠানিক জবাব আসার আগে থেকেই এই প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান বেশ কঠোর ও অনমনীয় বলে মনে করা হচ্ছিল।

 

গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, তিনি ইরানের দেওয়া নতুন এই প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

 

ওই দিন তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা সীমিত করার যে গুঞ্জন বা খবর ছড়িয়ে পড়েছে, তার বিন্দুমাত্র কোনো সত্যতা নেই।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই কঠোর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছিলেন যে, আলোচনার পথ হয়তো আপাতত চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই প্রকাশ্য ঘোষণার কয়েকদিন পরই এই আনুষ্ঠানিক জবাব হস্তান্তরের ঘটনাটি পুরো পরিস্থিতিকে নতুন একটি মোড় দিয়েছে।

 

এই সংঘাতের কূটনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকিলে দেখা যায়, মাত্র কয়েক মাস আগে গত জুন মাসে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দেশ পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ও জোরালো মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

সেই চুক্তিটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল এবং শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যায়।

 

উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে পুনরায় ভয়াবহ সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আগের চেয়েও আরও বেশি উত্তপ্ত করে তোলে। সেই ব্যর্থ চুক্তির প্রেক্ষাপটেই বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছিল, বর্তমানের নতুন প্রস্তাবেও মূলত সেই একই শর্তাবলি ও দাবিগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

 

বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে, দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের পাঠানো এই গোপন বার্তার বিষয়বস্তু এবং তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

 

সংঘাতের অবসান ঘটে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ প্রশস্ত হবে, নাকি নতুন করে কোনো ভয়াবহ ও সর্বাত্মক সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হবে, তা আগামী কয়েক দিনের নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্য দিয়েই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

 

- রয়টার্স