বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানি বিজ্ঞানীদের অবদানকে বিজয়ের মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করলেন শীর্ষ কমান্ডার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

ইরানি বিজ্ঞানীদের অবদানকে বিজয়ের মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করলেন শীর্ষ কমান্ডার
ছবি : Collected

মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং দেশের তরুণ ও প্রতিভাবান জনগোষ্ঠীর সঠিক বিকাশই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মরক্ষা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং যেকোনো ধরনের আগ্রাসী সংকট মোকাবলার সবচেয়ে শক্তিশালী ও অবিকল্প হাতিয়ার।

 

সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের প্রতিরক্ষা কৌশলের ক্ষেত্রে এই সত্যটি আরও একবার জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান এবং কেন্দ্রীয় খাতামুল আম্বিয়া (সা.) সদর দপ্তরের সম্মানিত কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি।

 

গত ১০ মেহর, যা একই সঙ্গে দেশের বিশিষ্ট মনীষী ও শহীদ ড. মোস্তফা চামরানের পবিত্র জন্মবার্ষিকী এবং ‘জাতীয় মেধাবী দিবস’ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়, সেই বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিনে প্রদত্ত এক সুদূরপ্রসারী ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তায় তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম পার্সটুডে এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি তাঁর এই বিশেষ বাণীতে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও তরুণ সমাজের মেধার সঠিক মূল্যায়ন, তাদের সৃজনশীল চিন্তাধারার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন।

 

তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত প্রাজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, জাতির স্থপতি ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার আদর্শে সবসময়ই মেধাবী ও মননশীল সমাজের প্রতি গভীর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়েছে।

 

তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল প্রখর বুদ্ধিমত্তা বা অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হওয়াটাই একজন মেধাবী মানুষের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। সত্যিকারের মেধাবী হওয়ার অর্থ হলো একটি গভীর মানবিক, ধর্মীয় এবং সর্বোচ্চ জাতীয় দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো।

 

একজন প্রকৃত মেধাবী ব্যক্তিকে অবশ্যই জ্ঞানপিপাসু, অকুতোভয়, আল্লাহবিশ্বাসী, সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার পতাকাবাহী এবং সমাজে প্রকৃত প্রভাব বিস্তারকারী হতে হবে।

 

নিজের সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত এই অসামান্য প্রতিভাকে ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা মাতৃভূমি ইরানকে সর্বাঙ্গীনভাবে শক্তিশালী করে তুলতে এবং একটি উন্নত ও আধুনিক ইসলামি সভ্যতা গড়ে তোলার মহৎ পথে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করতে হবে।

 

দেশের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের দায়িত্বশীলদের প্রতি অত্যন্ত কড়া ও সময়োপযোগী আহ্বান জানিয়ে মেজর জেনারেল আবদুল্লাহি বলেন যে, মেধাবীদের অগ্রযাত্রার পথে যত ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দূর করতে হবে।

 

তরুণ ও গবেষকদের নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা, অভিনব ধারণা এবং বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলোকে কেবল মৌখিক প্রশংসা না করে, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের চাকা সচল রাখতে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে এই মেধাবী ও প্রতিভাবান মুখগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

 

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যদি উপযুক্ত সুযোগ এবং অনুকূল পরিবেশ প্রদান করা যায়, তবে তা কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশই ঘটাবে না, বরং সমগ্র জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকেও বহুগুণে ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

দেশের সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে কর্মরত মেধাবী কমান্ডার, চৌকস কর্মকর্তা এবং প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের নিরলস ও আত্মত্যাগী প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করে মেজর জেনারেল আবদুল্লাহি বলেন যে, তাদের এই ঐকান্তিক সাধনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানই দেশকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

 

বিশেষ করে অতীতে দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সংকট ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই মেধাবী বিজ্ঞানীদের নিরলস ও দেশপ্রেমিক প্রচেষ্টা এক ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে।

 

তাদের এই দেশপ্রেমিক ও ক্লান্তিহীন প্রয়াসই ইরানের সামরিক সক্ষমতার অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও গতিশীল করে তুলেছে এবং বৈদেশিক নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে দেশীয় উন্নত প্রযুক্তির ওপর ভর করে দেশের বীর যোদ্ধাদের আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে সজ্জিত করার সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

 

এই দেশীয় প্রযুক্তির আত্মনির্ভরশীলতাই আজ ইরানকে যেকোনো ধরনের বাহ্যিক আগ্রাসন ও অন্যায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দুর্ভেদ্য শক্তি জুগিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহির এই সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী বার্তাটি কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার প্রধান কৌশলগত দর্শন।

 

আধুনিক যুদ্ধকৌশল এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে প্রথাগত সামরিক শক্তির পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেধার বিকাশই এখন বিজয়ের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যেভাবে বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক বৈরী পরিবেশ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে নিজের আত্মনির্ভরতার ভিত মজবুত করেছে, তার পেছনে কাজ করেছে এ দেশের অগণিত মেধাবী তরুণ, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের অসামান্য অবদান।

 

অতীতে দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই মেধাবীরাই যেভাবে জাতির প্রতিরক্ষায় নিজেদের মেধা ও মনন নিবেদন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ বা সংকটের মোকাবিলায় এই মেধাবী সমাজই যে বিজয়ের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে, তা এই প্রবীণ সামরিক কমান্ডারের বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে।

 

পরিশেষে, জাতীয় মেধাবী দিবসের এই প্রাক্কালে শীর্ষ এই সামরিক কমান্ডারের বক্তব্য সমগ্র জাতির সামনে একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিক, নীতিনির্ধারক এবং প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের বুঝতে হবে যে, মেধার মূল্যায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি দেশকে সত্যিকারের পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

বাহ্যিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইরান যেভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় একের পর এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে চলেছে, তার মূলে রয়েছে নিজস্ব মেধার ওপর অগাধ আস্থা ও নির্ভরতা।

 

আগামী দিনেও দেশের এই তরুণ ও মেধাবী সমাজ তাদের স্বীয় প্রতিভা, দেশপ্রেম এবং ইসলামি মূল্যবোধের আলোয় দেশকে উন্নয়নের আরও উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে-এটাই সমগ্র জাতির পরম প্রত্যাশা।

 

- পার্সটুডে