অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ডেভিস দেশটির যুদ্ধপন্থী নেলী ও নীতিনির্ধারকদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, সামরিক শক্তির জোরে ইরানকে পরাজিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পার্সটুডে এই গুরুত্ববহ মন্তব্যটি প্রকাশ করেছে, যা বিশ্ব রাজনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর সামরিক কৌশলগত মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুত করা এই বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং ইরানের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির বিষয়টি অত্যন্ত প্রখরভাবে ফুটে উঠেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত ধারাবাহিক কিছু সুদূরপ্রসারী বার্তায় ড্যানিয়েল ডেভিস ইরানের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কৌশলের বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইরান গত কয়েক দশক ধরে প্রচলিত কোনো আক্রমণাত্মক বিমানযুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রথাগত প্রস্তুতি নেয়নি; বরং দেশটি যেকোনো ধরনের আগ্রাসী আক্রমণ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য অত্যন্ত সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ ভূ-কৌশলগত দুর্গ এবং দুর্ভেদ্য সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছে।
তেহরানের এই প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতাকে রূপক অর্থে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে এই মার্কিন বিশ্লেষক ইরানকে প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন ও শক্ত শিলা গ্রানাইট পাথরের তৈরি একটি সুবিশাল পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এই বিশ্লেষণে তিনি জোরালোভাবে বলেন যে, আধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা দিয়েও কখনো একটি গ্রানাইট পাহাড়কে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ঠিক একইভাবে সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটালেও ইরানকে পরাস্ত করা কোনো পক্ষের পক্ষেই সম্ভব হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি করেছেন।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে ড্যানিয়েল ডেভিস বলেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত বা উত্তেজনাকে নতুন কোনো বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আগে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
কোনো ধরনের রাজনৈতিক লোকরঞ্জন বক্তব্য, অপপ্রচার বা মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে সম্পূর্ণ নিখুঁত ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার নিরিখেই হোয়াইট হাউসকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
কারণ প্রায়শই রাজনৈতিক নেতাদের উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য ও স্লোগান প্রকৃত বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে জনসমক্ষে আড়াল বা সম্পূর্ণ বিকৃত করে তোলে, যা কোনো পরাশক্তির জন্যই দীর্ঘমেয়াদে মঙ্গলজনক হতে পারে না।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কেউ যদি এমন দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকেন যে ইরানকে নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ করা যাবে এবং তার বিপরীতে তেহরান কোনো সমমানের বা সমানুপাতিক পাল্টা সামরিক জবাব দেবে না, তবে তিনি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবতাবিবর্জিত এক কাল্পনিক জগতে বসবাস করছেন।
বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ডেভিস অতীতে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত প্রতিক্রিয়াগুলোর উদাহরণ টেনে বলেছেন যে, ইরান ইতিমধ্যেই বিশ্ববাসীকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে তাদের ভূখণ্ড বা স্বার্থের দিকে যেকোনো দিক থেকে যা-ই নিক্ষেপ করা হোক না কেন, তার দাঁতভাঙা ও কার্যকর জবাব দেওয়ার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
এর বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন ও পশ্চিমা সামরিক বাহিনীগুলো প্রমাণ করেছে যে ইরানের নিক্ষিপ্ত শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণগুলোর প্রতিটি পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও ত্রুটিহীন বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পেন্টাগনের হাতে নেই।
এই ভারসাম্যহীন সামরিক সমীকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে চলমান এই সংঘাত আরও তীব্র ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি সৎ, নিরপেক্ষ ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিণতি কিংবা ক্ষয়ক্ষতির কথা বিন্দুমাত্র বিবেচনা না করে হঠকারিতাবশত পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তোলা ওয়াশিংটনের জন্য কোনোভাবেই কোনো বুদ্ধিমান বা দূরদর্শী কৌশল হতে পারে না।
পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরে এই অভিজ্ঞ মার্কিন কর্মকর্তা আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, এই আত্মঘাতী সংঘাতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত খরচ আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চলমান এই ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বেরিয়ে আসার নিরাপদ পথ খুঁজে বের করা।
বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটা-এমনকি জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কঠিন বা আপাতদৃষ্টিতে ‘খারাপ’ রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোও-সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই অলীক আশায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয় যে শেষ পর্যন্ত কোনো কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হবে।
তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক কৌশলগত ভুলগুলোর একটি ছিল এই অন্ধ ধারণা পোষণ করা যে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বা সংঘাত বৃদ্ধি করলে তার জন্য কোনো ধরনের নেতিবাচক পরিণতি বা মাসুল যুক্তরাষ্ট্রকে ভোগ করতে হবে না।
অথচ বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এই ভুল নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ড্যানিয়েল ডেভিসের এই সাহসী ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক নীতিতে নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রয়োজনীয় সামরিক সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও বেশি বেগবান করবে।