বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিমান ছিনতাইচেষ্টা, ইরানের সংশ্লিষ্টতা এখনই বলা যাচ্ছে না - মন্তব্য নেতানিয়াহুর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

বিমান ছিনতাইচেষ্টা, ইরানের সংশ্লিষ্টতা এখনই বলা যাচ্ছে না - মন্তব্য নেতানিয়াহুর
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক রোমহর্ষক ও ভয়াবহ বিমান নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব অভিমুখে যাত্রা করা একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ককপিটের ভেতরে পাইলটকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালানো হয়।

 

এই আকস্মিক ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিমান ছিনতাই বা অন্তর্ঘাতমূলক ওই অপচেষ্টার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি বলে পরিষ্কার জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

 

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর ২০২৬) ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে এই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিককালের অন্যতম গুরুতর বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে নতুন এক মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।

 

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত বুধবার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দুবাই থেকে ১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ফ্লাইটমাইড্রাইভের আওতাধীন ফ্লাইট এফজেড১০৭৩।

 

ফ্লাইটটি উড্ডয়ন করার ঠিক দুই ঘণ্টা পর আকাশসীমায় অত্যন্ত নাটকীয় ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বিমান ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, আকস্মিক ও রহস্যজনকভাবে বিমানটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ১৭ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতা থেকে নিচের দিকে নেমে যেতে শুরু করে।

 

পরবর্তীতে বিমানটির ভেতরে থাকা অসীম সাহসী যাত্রী এবং পেশাদার ক্রু সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একত্রিত হয়ে চরম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তারা অত্যন্ত শক্তভাবে বলপ্রয়োগ করে মূল হামলাকারীকে নিবৃত্ত করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেন।

 

ককপিটের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই প্রাণঘাতী লড়াইয়ের সময় ভারতীয় নাগরিক ও ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেইন স্মিত মাচ্ছার মারাত্মকভাবে জ ছুরিকাহত হন। তবে ক্রু ও যাত্রীদের সম্মিলিত প্রতিহত করার কারণে আকাশে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

 

বর্তমান সময়ে সৌদির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আহত পাইলট ক্যাপ্টেইন স্মিত মাচ্ছার শঙ্কামুক্ত রয়েছেন বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁকে অত্যন্ত প্রশংসাসূচকভাবে 'প্রকৃত বীর' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

ফ্লাইটের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইয়ানিভ হায়ুন নামের এক বিমানযাত্রী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, অভিযুক্ত হামলাকারী যখন অত্যন্ত সুকৌশলে বিমানটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বা বিধ্বস্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যান এবং হামলাকারীর ঘাড় শক্ত করে চেপে ধরেন।

 

তাঁর এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে অন্যান্য যাত্রীরাও মুহূর্তের মধ্যে সাহসী হয়ে ওঠেন এবং সম্মিলিতভাবে ওই হামলাকারীকে জাপ্টে ধরে ককপিটের এক কোণে আটকে ফেলেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিয়মাবলী অনুযায়ী বিমানটি সৌদি আরবের একটি নির্ধারিত বিমানবন্দরে অত্যন্ত নিরাপদে জরুরি অবতরণ করতে সক্ষম হয়।

 

প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি পৃথক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানান যে, সৌদি আরবের মাটিতে আটক থাকা ওই সন্দেহভাজন হামলাকারীকে পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হস্তান্তর করা হতে পারে, কারণ এই ফ্লাইটটি আমিরাতের মাটি থেকেই তার যাত্রা শুরু করেছিল।

 

এই পুরো নাশকতামূলক ঘটনার পেছনে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ইরানের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা বা দূরভিসন্ধি কাজ করছে কি না-এমন এক সুনির্দিষ্ট ও স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে বলেন যে, বর্তমান প্রাথমিক পর্যায়ে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা অত্যন্ত কঠিন।

 

বর্তমানে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটককৃত পাইলট ও সন্দেহভাজন হামলাকারীকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান প্রসিকিউটর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এই ছিনতাইচেষ্টার পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে কি না, তা উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ যৌথ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

 

ঘটনার নিখুঁত সত্যতা উদঘাটনের জন্য ইসরায়েলের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল কাজ করছে। তেল আবিবে অবতরণের পর বিমানটির যাত্রীদের কাছ থেকেও ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ ও সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রগুলোর বরা বিবিসি অ্যারাবিক জানিয়েছে যে, প্রাথমিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে অভিযুক্ত হামলাকারী ব্যক্তিটির মূল পরিকল্পনা ছিল বিমানটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া।

 

ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ এর এই উড্ডয়ন ও আকস্মিক বিপদের পথপরিক্রমা অত্যন্ত নাটকীয় ছিল। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ার ঠিক দুই ঘণ্টা পর বিমানটি রাডারে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে।

 

ফ্লাইটরাডার২৪ এর মাধ্যমেই প্রথম বিশ্ববাসী জানতে পারে যে বিমানটি ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে গেছে। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর বিমানটি থেকে জরুরি বার্তা পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিমান চালনার পরিভাষায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি বোঝাতে বিমান ছিনতাই চেষ্টার সতর্কবার্তা সংবলিত '৭৫০০ কোড' সংকেত প্রেরণ করা হয়।

 

এই সংকেত পাঠানোর প্রায় বিশ মিনিটের ব্যবধানে বিমানটি সৌদির মাটিতে অবতরণের উদ্দেশ্যে স্বয়ংক্রিয় চালনা ব্যবস্থা বা অটো পাইলট বাতিল করে সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি নিচে নামতে শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পর বিমানটি পুনরায় সাধারণ জরুরি অবস্থার সংকেত '৭৭০০ কোড'-এ ফিরে আসে।

 

এই চরম সংকটের মুহূর্তে পাইলটদের অভাবনীয় সাহসিকতা এবং পেশাদারিত্ব বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংস কুড়িয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও গুরুতর আহত ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছারকে একজন প্রকৃত বীর হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি প্রজ্ঞাপনে নেতানিয়াহু লিখেছেন যে, অত্যন্ত গুরুতরভাবে ছুরিকাহত এবং রক্তক্ষরণের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেইন মাচ্ছার পিছপা হননি; বরং তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন, চরম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং অন্যান্য যাত্রী ও ক্রুদের আক্রমণকারীকে পরাস্ত করার মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছেন।

 

তাঁর এই ঐতিহাসিক সাহসিকতার ফলেই শত শত মানুষের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। একইভাবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর দাপ্তরিক বার্তায় লিখেছেন যে, চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এবং মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্যদের জীবন বাঁচাতে যে অসীম সাহসিকতা ও লোহাময় দৃঢ় সংকল্পের পরিচয় দিয়েছেন, তা সমগ্র জাতির জন্য এক পরম গৌরবের বিষয়।

 

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বিবিসিকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এই ঘটনাকে মানব ইতিহাসের এক অনন্য সাধারণ ঐক্য ও বীরত্বের নিদর্শন বলে অভিহিত করেছেন এবং অলৌকিকভাবে যাত্রীদের প্রাণ রক্ষা পাওয়ার পেছনে এই ভারতীয় পাইলটের অবদানের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। আন্তর্জাতিক এই বিমান সংকটের সামগ্রিক তদন্ত সমাপ্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এর কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।