শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন প্রতিরক্ষা মোর্চা ‘মক্কা জোটে’ যোগ দিতে আগ্রহী অর্ধডজনের বেশি দেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

নতুন প্রতিরক্ষা মোর্চা ‘মক্কা জোটে’ যোগ দিতে আগ্রহী অর্ধডজনের বেশি দেশ
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতিতে এক নতুন ও যুগান্তকারী সমীকরণের জন্ম দিয়ে বিশ্বের ছয়টিরও বেশি সার্বভৌম দেশ নবগঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে’ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

 

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর ও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছেন।

 

গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই বহুমুখী সামরিক ও নিরাপত্তা মোর্চাটি সম্পূর্ণরূপে একটি রক্ষণাত্মক প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

 

এর মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা শক্তির ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আগ্রাসন চালানো নয়, বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা স্থাপত্যে এক নতুন ভারসাম্য আনতে এই জোট অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

চলতি বছরের গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র ও ঐতিহাসিক নগরী মক্কায় ইসলামি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী তিনটি রাষ্ট্র পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের যৌথ উদ্যোগে এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল।

 

ঐতিহাসিক মক্কা নগরীতে এই যুগান্তকারী প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কারণে বিশ্ব কূটনীতিতে এটি ইতোমধ্যে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এই জোটটির মূল কাঠামো ও কার্যক্রম অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে তৈরি করা হয়েছে।

 

ন্যাটোর আর্টিকেল ফাইভ বা সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতির অনুকরণে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সনদে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, জোটভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যদি কোনো একটি দেশের ওপরও কোনো ধরনের সশস্ত্র সামরিক আগ্রাসন বা হামলা চালানো হয়, তবে সেই আক্রমণকে সামগ্রিকভাবে জোটের প্রতিটি সদস্যের ওপর সংঘটিত সশস্ত্র আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সম্মিলিতভাবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

 

সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান মুহূর্তে ঠিক কোন কোন সার্বভৌম রাষ্ট্র এই জোটে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তাদের সুনির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন।

 

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি মুসলিম প্রধান দেশের নীতিনির্ধারকরা এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে তীব্র কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

এর আগে গত ৩১ আগস্ট এই ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম আনুষ্ঠানিক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জোটের মূল প্রশাসনিক সদরদপ্তর পবিত্র সৌদি আরবে স্থাপন করার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

পাশাপাশি, জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ লেফট্যানেন্ট জেনারেল নওমান মাহমুদকে। পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে সেনাপ্রধানের এই সাবেক সহযোগীকে একজন অত্যন্ত দক্ষ, চৌকস, সৎ এবং ধার্মিক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেন, যা এই পদের গাম্ভীর্য ও গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে পরিচালিত ধারাবাহিক এবং উদ্বেগজনক হামলাগুলোর তীব্র প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ইসহাক দার জানান যে, উদ্ভূত এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে আগামী সপ্তাহেই মক্কা জোটের একটি জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।

 

সেই বৈঠকে সৌদির সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষার রূপরেখা অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তান এবং এই জোটের প্রতিটি সদস্য দেশ সর্বতোভাবে প্রস্তুত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রয়েছে।

 

তারা সৌদিকে রক্ষার এই পবিত্র দায়িত্বে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করেন। আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করেন যে, জাতিসংঘের মূল সনদের বিভিন্ন ধারায় এ ধরনের আঞ্চলিক যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠনের এবং সম্মিলিতভাবে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট আইনি অনুমতি ও স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

 

ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের এই পথচলা আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি নয়, বরং এটি আঞ্চলিক শান্তি ও সুরক্ষাকে সুসংহত করার এক বৈধ প্রয়াস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তজুড়ে যে চরম অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই এবং বহুমুখী সামরিক সংঘাতের কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়েছে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই জোটটি মুসলিম বিশ্বের নিজস্ব সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

 

অর্ধডজনেরও বেশি নতুন দেশের এই জোটে যোগদানের আকুল আগ্রহ কেবল এর ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণ করে না, বরং এটি বিশ্ব নিরাপত্তার মানচিত্রে একটি নতুন শক্তির মেরুকরণের ইঙ্গিত বহন করে, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও গভীর প্রভাব ফেলবে।

 

- জিও টিভি