শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়েমেন সরকারকে রক্ষায় চার কার্গো বিমানে অস্ত্র পাঠাল পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

ইয়েমেন সরকারকে রক্ষায় চার কার্গো বিমানে অস্ত্র পাঠাল পাকিস্তান
ছবি : Collected

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারকে শক্তিশালী করতে চার কার্গো বিমানে করে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠিয়েছে পাকিস্তান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে পর্যায়ক্রমে প্রেরিত এই সামরিক চালানের মধ্যে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, অত্যাধুনিক ড্রোন এবং কার্যকর ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে পাকিস্তানের সরাসরি এই সামরিক অংশগ্রহণ এমন এক সময়ে ঘটল যখন সমগ্র অঞ্চলজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাতের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে।

 

কেবল অস্ত্র সরবরাহ করাই নয়, ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি সামরিক বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সহায়তার জন্য পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও বর্তমানে সেখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন বলে রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইয়েমেন সংকট নিরসনে এবং সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুরক্ষায় পাকিস্তান তাদের সামরিক সহযোগিতা আরও অনেক বেশি দৃশ্যমান ও সংহত করছে।

 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক প্রভাবশালী পশ্চিমা ও আরব দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে স্বনামধন্য আঞ্চলিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে যে, বিদ্রোহী হুথিদের সামরিক হুমকি ও আক্রমণ পুরোপুরি প্রতিহত করতে ইয়েমেনে খুব দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে সৌদি আরব।

 

সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের তীব্র আক্রমণ ও অগ্রগতির কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার এক চরম ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

উদ্ভূত এই ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেই মূলত রিয়াদ এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট এবং সমুদ্র যোগাযোগের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য সৌদি আরবের এই সামরিক উদ্যোগ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের আশপাশে গত কদিন ধরে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সংঘাতের এই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার হুথি বিদ্রোহীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।

 

ধ্বংসপ্রাপ্ত এই সেতুটি তাইজ শহরের নিকটবর্তী সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনের যোগাযোগের প্রধান ও নির্ভরযোগ্য সংযোগপথ ছিল।

 

এই যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে তাইজ অঞ্চলে মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। যোগাযোগ ও সরবরাহের এই পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামরিক ও বেসামরিক উভয় পক্ষই চরম কৌশলগত চাপের মুখে রয়েছে।

 

এই সর্বাত্মক সংঘাতে বিদ্রোহী হুথিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার পাল্টা জবাব দিতে তাইজ ও সংলগ্ন এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সৌদি বিমান বাহিনী মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রায় চৌানব্বইটি পৃথক বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

তবে রিয়াদের সামরিক সূত্রগুলো এই দাবির ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে যে, সানা, সাদা এবং তাইজ অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার ও বিদ্রোহীদের কমান্ড সেন্টারগুলোকে লক্ষ্য করেই কেবল এই নিখুঁত বিমান হামলাগুলো পরিচালনা করা হয়েছে।

 

এই লাগাতার বিমান আক্রমণের ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সামরিক অবকাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করছে সৌদি জোট। সাম্প্রতিক এই সামরিক ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে এক নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

 

বিশেষ করে চলতি বছরের আগস্ট মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ত্রিমুখী সামরিক জোটের কার্যকারিতা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান ইয়েমেন সংকট হলো সেই সদ্য স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান বাস্তব পরীক্ষা। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সুদৃঢ় কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসলামাবাদকে তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের বিষয়টিও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

 

বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি তেহরানের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থনের বিষয়টি পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত করার জন্য সর্বাত্মক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সৌদি আরব। এই ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেন সংঘাতের ইস্যুতে নানা কারণে মতপার্থক্য ও দূরত্ব তৈরি হওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও পারস্পরিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।

 

উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বরফ গলাতে এবং অভিন্ন নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় একটি সুসংহত যৌথ অবস্থান তৈরি করার জন্যই এই কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

 

সবমিলিয়ে, সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের সামরিক প্রস্তুতি, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পাঠানো কার্গো বিমানভর্তি অস্ত্র সহায়তা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যকার নতুন ও জটিল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা-এই সমস্ত উপাদান মিলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতটিকে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক, জটিল ও নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ে উপনীত করেছে।

 

- মিডল ইস্ট আই