তবে বছরের পর বছর ধরে চলা অবরুদ্ধ অবস্থা, লাগাতার সংঘাত এবং ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাওয়া গাজাবাসীর কাছে এই নির্বাচন নিছক কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল নয়।
দুই দশকের রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর গাজার প্রায় ১২ লাখ ২৪ হাজার ভোটার এখন ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারানো এই উপত্যকার লাখ লাখ মানুষের মূল প্রত্যাশা এখন কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা ফাঁপা প্রতিশ্রুতি নয়; বরং তারা চান মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ, একটি নিশ্চিত কর্মসংস্থান, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের ছাইভস্ম থেকে নিজেদের প্রিয় মাতৃভূমিকে নতুন করে গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ।
গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ শহরের এক ছোট ইন্টারনেট কার্ড বিক্রির দোকানে বসে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কথা ভাবছিলেন ২৪ বছর বয়সী তরুণ আহমেদ মহসেন। তিন বছর আগে, গাজায় ইসরায়েলের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তাঁর জীবনের গতিপথ এবং স্বপ্ন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেসময় নার্সিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন সম্পন্ন করে পেশাগত সনদপত্র পাওয়ার সব প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল গাজার কোনো আধুনিক হাসপাতালে সেবাদানকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা, উচ্চশিক্ষার জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষায়িত কোর্স সম্পন্ন করা।
কিন্তু আকস্মিক যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর সেই সাজানো জীবনকে এক নিমেষে তছনছ করে দেয় এবং সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। যুদ্ধের শুরুর দিকের সংকটময় মাসগুলোতে আহমেদ মহসেন জীবন বিপন্ন করে দেইর আল-বালাহের আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।
প্রতিনিয়ত অসংখ্য আহত ও রক্তাক্ত মানুষের নির্মম আর্তনাদ এবং লাশের মিছিলের মধ্যে তিনি দিনরাত সেবা দিয়ে গেছেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ধরনের বেতন বা আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েই তাঁকে অন্য কাজের সন্ধান করতে হয়।
তিনি আক্ষেপ করে জানান, নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দেওয়ার পরও পরিবারকে সচল রাখার মতো অর্থ জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেকারণেই জীবনধারণের ন্যূনতম আয়টুকু নিশ্চিত করতে তিনি স্বাস্থ্যসেবার পেশা ছেড়ে ইন্টারনেট কার্ড বিক্রির মতো একটি অস্থায়ী ও সামান্য কাজের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন।
আগামী ২৮ নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে আহমেদ মহসেনের জীবনের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। ২০০৬ সালের পর ফিলিস্তিনে আর কোনো জাতীয় নির্বাচন না হওয়ায় তাঁর পুরো প্রজন্মই নাগরিক গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এই তরুণের কাছে আসন্ন নির্বাচনের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো খুবই স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। তিনি চান যে প্রার্থীরা তাঁদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় গাজার তরুণ প্রজন্মের বেকারত্ব, আবাসন সংকট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক ও জরুরি বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরুক।
মহসেন জানান, তাঁর প্রথম ও প্রধান দাবি হলো একটি সম্মানজনক বেতনসহ স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া, যাতে তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারেন; আর দ্বিতীয় জরুরি বিষয়টি হলো জীবনের নিরাপত্তা।
মহসেনের এই উদ্বেগ ও চরম অনিশ্চয়তা আসলে গাজা উপত্যকার প্রায় প্রতিটি নাগরিকের সাধারণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। বহু বছরের টানা ইসরায়েলি অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সাম্প্রতিক বিধ্বংসী যুদ্ধের কারণে গাজার অর্থনীতি আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে বর্তমানে বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।
এই হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মহসেনের পরিবারের নিজস্ব জমি রয়েছে গাজার সালাহ আল-দিন সড়কের পূর্বাঞ্চলে, কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সেই ভিটেমাটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না।
তিনি আশা প্রকাশ করছেন যে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তানুযায়ী ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশেষে ওই অঞ্চল থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজায় দ্রুত পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করার পথ সুগম করবে।
তবে আহমেদ মহসেনের মতো তরুণেরা কেবল ভোটের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। যদি এই নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে তাঁর কাছে এর কোনো মূল্য নেই।
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, একজন আদর্শ প্রার্থীর উচিত জনগণের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করা এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের কণ্ঠে প্রকাশ করা, অন্যের তৈরি প্রথাগত নীতি আওড়ানো নয়। বিশ বছর ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ, বিনাশ ও বঞ্চনার শিকার হওয়া তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাসের কথা এই নির্বাচনে সোচ্চার হতে হবে এবং এই অসীম দুর্ভোগের একটি চিরস্থায়ী অবসান ঘটতে হবে।
তরুণ মহসেনের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ৫৩ বছর বয়সী স্বর্ণশিল্পী ঘাসান মারওয়ান এখনো হৃদয়ে লালন করেন ২০০৬ সালের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের অমলিন স্মৃতি। সেসময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বাধীন রাজনীতিবিদ মুস্তফা বারগুতির নেতৃত্বাধীন তালিকার পক্ষে নুসেইরাতের একটি স্থানীয় স্কুলে গিয়ে স্বচ্ছ ও সততার সাথে ভোট দিয়েছিলেন তিনি।
তিনি স্মরণ করেন, সেদিনের নির্বাচনটি ছিল আনন্দঘন ও উৎসবমুখর একটি গণতান্ত্রিক মুহূর্ত। সেসময় তিনি আশা করেছিলেন যে, এই ভোটের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং তাঁর সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তী বিশটি বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা সেই গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনরাবৃত্তি আর দেখতে পায়নি। আজ বিশ বছর পর ঘাসান মারওয়ানের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধের করাল গ্রাসে নিজের সারা জীবনের উপার্জনে গড়া পাকা বাড়ি এবং স্বর্ণের কারখানা দুটিই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি।
দীর্ঘ ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা সম্পদ ও স্থিতিশীলতা আজ এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি তাঁর সন্তানদের নিয়ে তাঁবুর নিচে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
যে বয়সে তাঁর আরাম-আয়াসে দিন কাটানোর কথা ছিল, সেখানে আজ প্রতিদিনের তৃষ্ণা মেটাতে বহুদূর থেকে কষ্ট করে খাবার পানি বয়ে আনতে হয় তাঁকে। এই ৫০ পেরোনো বয়সে পানি বহনের মতো শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক যন্ত্রণা তাঁকে চরম হতাশায় নিমজ্জিত করেছে।
এই পর্বতসম ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তা গাজাবাসীর রাজনীতিচর্চার আগ্রহকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মারওয়ানের মতে, রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ এটি নয় যে তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নন, বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশা ও বঞ্চনাই মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নিস্পৃহ করে তুলেছে।
গাজার মানুষের সমস্ত মনোযোগ এখন কেবল একটাই বিষয়ে নিবন্ধিত-কীভাবে টিকে থাকা যায় এবং পরিবারের জন্য একমুঠো অন্নের সংস্থান করা যায়। চারপাশের এমন নিঃসীম ধ্বংসস্তূপ ও মানবেতর আশ্রয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ভোটের আলোচনাকে মাঝেমধ্যে উপহাস বলে মনে হয় তাঁর কাছে, কারণ মুক্ত ও স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো স্পষ্ট কোনো পরিবেশ বা ভিত্তি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ভোটগ্রহণের ব্যাপক প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। কমিশন হিসাব করে দেখেছে যে গাজায় প্রায় ১২ লাখ ২৪ হাজার নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য।
তবে গাজায় ফিলিস্তিনি নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক পরিচালক জামিল আল-খালিদি জানান, পুরো অঞ্চলজুড়ে অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণ-বাস্তুচ্যুতির কারণে এই নির্বাচন পরিচালনা করা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ।
ইসরায়েল যদি বাইরে থেকে নির্বাচনী সামগ্রী সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে, তবে স্থানীয়ভাবেই তা তৈরি ও বিতরণের আকস্মিক বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গাজার বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ইয়াদ আল-কাররা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ গাজাবাসীর রাজনৈতিক চেতনাকে ধূলিসাৎ করেনি, বরং তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাশার ধরন বদলে দিয়েছে।
টানা তিন বছরের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং উপার্জনের পথ হারিয়ে ফেলিস্তিনিদের রাজনৈতিক দাবি এখন আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বা চটকদার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
তাদের মূল দাবি এমন এক যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যারা রাজনৈতিক স্লোগানের ঊর্ধ্বে উঠে গাজার অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
পরিশেষে, গাজাবাসী এমন এক নতুন দিনের অপেক্ষায় রয়েছে যেখানে নির্বাচন কেবল ব্যালট পেপারের আনুষ্ঠানিকতা হবে না, বরং তা হবে ধ্বংসের ছাই থেকে তাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর এবং একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গঠনের বাস্তব চাবিকাঠি।