শুক্রবার, অক্টোবর ২, ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, পাঠাচ্ছে ১০ হাজার সেনাও

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, পাঠাচ্ছে ১০ হাজার সেনাও
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতিকে অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃত আলোচনার মধ্যেই ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আরও একটি অতিশয় শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে।

 

ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট নামের এই বিশালাকার যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত সামরিক সদস্যকে সেখানে পাঠাবে পেন্টাগন। এই নতুন বহরটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছালে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে মোট মার্কিন নৌ ও মেরিন সেনার সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

 

এর পাশাপাশি সমন্বিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন রাখা হচ্ছে কয়েক শত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ সেনা ও সামরিক সজ্জার নতুন উপস্থিতি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির অতি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মার্কিন নির্বাচনের সূচি ও সার্বিক গতিপ্রকৃতির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নতুন সামরিক তৎপরতার একটি গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

 

বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন মহলে শঙ্কা রয়েছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের সামরিক বা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নতুন করে কোনো বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।

 

এ ধরনের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং প্রতিপক্ষের দিক থেকে আসতে পারা পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই পেন্টাগন নিজেদের সামরিক শক্তি নতুন করে বিন্যাস করছে।

 

পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। পেন্টাগনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে, ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট এবং এর সাথে যুক্ত সম্পূর্ণ স্ট্রাইক গ্রুপ, যার মধ্যে একাধিক বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ ও বিশেষায়িত সামরিক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা আগামী নভেম্বর মাসের শেষভাগ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের নির্ধারিত জলসীমায় গিয়ে পৌঁছাবে।

 

বর্তমানে পারস্য উপসাগর ও সংলগ্ন কৌশলগত সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বৃহৎ বিমানবাহী রণতরী আগে থেকেই সক্রিয়ভাবে অবস্থান করছে। এগুলো হলো ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ এবং ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন।

 

একই সময়ে এবং একই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি বৃহৎ রণতরীর এই ধরনের একযোগে সমাবেশ ঘটার ঘটনা সাম্প্রতিক কালের আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এর মাধ্যমে পেন্টাগন উক্ত কৌশলগত সমুদ্রসীমায় নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাবের স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক জলসীমায় বহরের এই পরিবর্তন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি পরিকল্পিত কৌশলগত বিন্যাসের অংশ। সাধারণত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন নামের রণতরীটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত থাকে।

 

কিন্তু বিশেষ বৈশ্বিক পেক্ষাপট বিবেচনা করে সম্প্রতি এটিকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সরিয়ে এনে মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে যুক্ত করা হয়েছিল। মূলত এর পেছনে প্রাথমিক কারণ ছিল এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসা অপর একটি প্রধান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং তাতে নিযুক্ত মার্কিন সেনাদের দীর্ঘদিনের কাজের ধকল হ্রাস করা এবং তাদের সাময়িক বিরতি দেওয়া।

 

টানা কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধভাবাপন্ন পরিবেশে দায়িত্ব পালন করার কারণে উক্ত আব্রাহাম লিংকনের সেনাদলের সার্বিক মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতায় ক্লান্তি নেমে এসেছিল।

 

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মুখোমুখি সামরিক অবস্থান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও মেরিন সেনাসদস্যদের সাধারণ সময়সীমার চেয়ে অনেক বেশি সময় একটানা উন্মুক্ত সমুদ্রে অবস্থান করতে বাধ্য হতে হয়েছিল।

 

এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ, জাহাজে অবস্থানরত সেনাদের মধ্যে ব্যাপক মানসিক অবসাদ ও হতাশাজনিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোনো যুদ্ধজাহাজের সামরিক সদস্যদের অতিরিক্ত সময় চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন রাখলে তাদের মানসিক স্থিতিশীলতায় প্রতিকূল প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

 

সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেনাদলের অভ্যন্তরীণ মানসিক চাপের বিষয়টি অনুধাবন করে মার্কিন সরকার অবশেষে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন রণতরীটিকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় এবং তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয় জর্জ ওয়াশিংটনকে।

 

পেন্টাগনের এই সাম্প্রতিক সামরিক বিন্যাস কেবল সৈন্য কিংবা যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্যে এক বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

প্রায় ২০ হাজারের বেশি সজ্জিত সশস্ত্র নৌ ও মেরিন সেনার সরাসরি অবস্থান এবং তাদের সহযোগিতায় প্রস্তুত থাকা শত শত কৌশলগত যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সংলগ্ন দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

 

যেকোনো মুহূর্তে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলের কারণেও বড় আকারের সামরিক সংঘাত শুরু হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপুল শক্তি বৃদ্ধি মূলত আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ বৃদ্ধি করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রয়াস।

 

এমনই এক সংকটময় পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাত এড়ানোর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের একটি ক্ষীণ চেষ্টা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল। সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে সম্ভাব্য বিধ্বংসী যুদ্ধ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে গত সপ্তাহে ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে একটি নতুন কূটনৈতিক শান্তি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়।

 

তেহরানের ঐ প্রস্তাবে দুই দেশের মধ্যকার চলমান বৈরী সম্পর্ক হ্রাস করা, বাণিজ্যিক জলপথের অবাধ নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নতুন শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশ আশা প্রকাশ করেছিল যে, এই আলোচনার মাধ্যমে হয়তো দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থান ও তৈরি হওয়া সামরিক অচলাবস্থার অবসান ঘটবে।

 

তবে তেহরানের পক্ষ থেকে আসা এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রস্তাবটি ওয়াশিংটন কোনো ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করেনি, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই প্রস্তাবটিকে সরাসরি বাতিল ও প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

প্রস্তাবটির ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে গণমাধ্যমের সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাষায় নিজস্ব বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে, ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং দেশটি চরম সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে।

 

ট্রাম্পের ভাষায়, মার্কিন প্রশাসনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও তীব্র সামরিক চাপের মুখে পড়ে ইরান বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েছে এবং এই কোণঠাসা অবস্থা থেকে রেহাই পেতেই তারা এখন সমঝোতার রাস্তা খুঁজছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের চলাচলের পথ অবারিত রাখতে এবং বাণিজ্যের সুযোগ পুনরায় উন্মুক্ত করতেই ইরান তড়িঘড়ি করে একটি নতুন চুক্তিতে উপনীত হতে চাইছে।

 

ওয়াশিংটনের মতে, ইরানের উত্থাপিত এই প্রস্তাব স্থায়ী শান্তির কোনো আন্তরিক প্রয়াস নয়, বরং এটি তাদের ওপর চাপানো কঠোর মার্কিন অবরোধ ও কৌশলগত চাপ লাঘব করার একটি সাময়িক চেষ্টা মাত্র।

 

প্রেসিডেন্টের এই কঠোর প্রত্যাখ্যানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নস্যাৎ হয়ে গেছে এবং এই অঞ্চলে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভূতপূর্ব সামরিক উপস্থিতি ও নতুন রণতরী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে ওয়াশিংটনের আপসহীন অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে।

 

আগামী নভেম্বর মাসের শেষভাগে ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট এই অঞ্চলে এসে পৌঁছালে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে, সেদিকেই এখন নজর রাখছে বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহল।

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে এভাবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে, তা কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।