গত কয়েক দিন ধরেই সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে আসছে হুথি বিদ্রোহীরা। এই হামলার ফলে ওই অঞ্চলে নতুন করে চরম সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপর এ ধরনের আঘাত আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বিবেচনা করা হলেও, হুথিরা তাদের এই ধ্বংসাত্মক সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই হামলার দায় নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে, আভা বিমানবন্দরে চালানো তাদের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী।
তার দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, এই সরাসরি আঘাতের ফলে বিমানবন্দরটির ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত বিমান চলাচলের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যদিও নিরপেক্ষ কোনো আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা প্রাণহানির কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবুও হুথি মুখপাত্রের এই জোরালো দাবি ওই অঞ্চলের আকাশপথে এক চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উন্নত প্রযুক্তির মারণাস্ত্র ব্যবহার করে বেসামরিক স্থাপনায় এ ধরনের আক্রমণ প্রমাণ করে যে, ইয়েমেন সংঘাত এখন আর কেবল নিজেদের ভৌগোলিক সীমান্তের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমগ্র আরব উপদ্বীপের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর প্রতি এক অত্যন্ত কঠোর, অভাবনীয় ও সরাসরি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করে কোনো যাত্রীবাহী বা বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করা এখন থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তাঁর ভাষায়, "সৌদি আরবের আকাশসীমায় বিমান চালালে ভবিষ্যতে কী ধরনের মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে, আমরা আমাদের সেই পূর্ববর্তী সতর্কতা আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করছি। তাদের আকাশসীমা এখন আমাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।"
এই ঘোষণার সোজা অর্থ হলো, সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহারকারী যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক বা যাত্রীবাহী বিমান হুথিদের আকস্মিক হামলার শিকার হতে পারে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এটি এক নজিরবিহীন এবং ভয়ংকর হুমকি, যা বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আকাশপথের নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হুথি বিদ্রোহীদের এই সর্বশেষ এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের সরকার বা সামরিক জোটের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া গণমাধ্যমে জানানো হয়নি। তবে এর আগে সৌদির জাজান এবং নাজরান শহরের বিমানবন্দরে হুথিদের চালানো হামলার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিল রিয়াদ প্রশাসন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তথ্যমতে, হুথিদের সেই পূর্ববর্তী হামলাগুলোতে জাজান ও নাজরান বিমানবন্দরের বেশ কিছু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং বেসামরিক মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়েছিল।
রিয়াদ বরাবরই আন্তর্জাতিক ফোরামে এই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান হুথি বিদ্রোহীদের উন্নত অস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হুমকিতে ফেলছে।
বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করে এমন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরব জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বারবার সোচ্চার হয়েছে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হুথিদের এই হামলার সমান্তরালে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যাপক সামরিক পটপরিবর্তনের খবর পাওয়া গেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল পরিষদ সরকারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, তারা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পানিপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশ থেকে হুথি যোদ্ধাদের সম্পূর্ণভাবে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
শুধু তাই নয়, লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণও এখন সরকারি বাহিনীর হাতের মুঠোয় রয়েছে বলে সামরিক সূত্রগুলো থেকে জোর দাবি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। তাই এই প্রণালির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেকোনো বাহিনীর জন্যই এক বিরাট কৌশলগত বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সামরিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর সোমবার লোহিত সাগরের উপকূল ধরে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের শক্তিশালী আকাশসীমার নিবিড় সহায়তায় ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
এই ঝটিকা ও সুপরিকল্পিত অভিযানের একপর্যায়ে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবস্থান থেকে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। এরপর উজ্জীবিত সরকারি বাহিনীর সদস্যরা সামনে এগিয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দিকে অগ্রসর হয়।
সোমবার স্থানীয় সময় বিকেলের দিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সদর্পে ঘোষণা করা হয় যে, ঐতিহাসিক মোখা শহর এখন সরকারি বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সরকারি বাহিনীর আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের যুদ্ধবিমানগুলোর অবিরাম এবং ব্যাপক বোমাবর্ষণের সহায়তায় সরকারি পদাতিক সৈন্যরা শহরটির একেবারে উপকণ্ঠে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
আকাশপথের এই বিধ্বংসী আক্রমণ ও স্থলপথের দ্বিমুখী প্রচণ্ড লড়াইয়ের মুখে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে হুথি যোদ্ধারা তাদের পূর্ববর্তী ঘাঁটিগুলো ছেড়ে আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে বলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খবর পাওয়া গেছে।
পাহাড়ি অঞ্চলে হুথিদের এই পশ্চাদপসরণ তাদের সামরিক শক্তিমত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধাক্কা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা। তবে, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ব্যাপক সাফল্যের দাবির সত্যতা এখন পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ বা স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্বারা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধের ময়দানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার না থাকা এবং তথ্য প্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকায় প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া বেশ কঠিন। অন্যদিকে, হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনি সরকারের এই মোখা দখল এবং বাব আল-মান্দেব এলাকা থেকে হটিয়ে দেওয়ার দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক প্রোপাগান্ডা বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তাদের পাল্টা দাবি, তারা এখনো নিজেদের সামরিক অবস্থানে অত্যন্ত শক্তভাবে অবস্থান করছে এবং শত্রুবাহিনীর যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, একদিকে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে বেসামরিক বিমানবন্দরে হুথিদের প্রাণঘাতী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং অন্যদিকে ইয়েমেনের ভেতরে লোহিত সাগরের উপকূলে সরকারি বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর-এই দুই বিপরীতমুখী ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটকে আরও বেশি জটিল, অনিশ্চিত ও রক্তক্ষয়ী করে তুলেছে।
আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধের এক নির্মম রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া ইয়েমেনের এই চলমান সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া রক্তক্ষয়ী এই সংকট সমাধানের কোনো সুস্পষ্ট পথ আপাতত দৃশ্যমান হচ্ছে না।