রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

সৌদি আরবে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ এলাকায় আবারও ভয়াবহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই আক্রমণ চালিয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির এবারের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনাগুলো।

 

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি রোববার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই হামলার ভয়াবহতা ও এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে এ ধরনের আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

রোববার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের অভ্যন্তরে চালানো এই ভয়াবহ হামলার পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান যে, রিয়াদ এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ খুরাইস অঞ্চলে অবস্থিত জ্বালানি খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান আরামকোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে তাদের যোদ্ধারা অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের মাধ্যমে এই সমন্বিত হামলা চালিয়েছে।

 

ইয়াহিয়া সারি তার বার্তায় এই আক্রমণকে সম্পূর্ণ সফল বলে দাবি করে স্পষ্টভাবে বলেন, "উভয় অভিযানই সফলভাবে লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে লক্ষ্যবস্তু করা আরামকোর স্থাপনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।"

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই আকস্মিক হামলার সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ সরকার যখন হুথিদের দখলে থাকা ভূখণ্ডগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক ও নতুন সামরিক অভিযান পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে, ঠিক তার পরপরই সৌদি আরবের মাটিতে এই পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটল।

 

ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি সম্প্রতি এক দৃঢ় ঘোষণায় জানিয়েছেন যে, ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট ভূখণ্ড উদ্ধার করা এবং সমগ্র দেশে পুনরায় বৈধ সরকারের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এক চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকারি বাহিনী।

 

সরকারের এই ঘোষণার পরপরই হুথিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান সামরিক বাহিনীর প্রতি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

 

অনুমোদিত সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত দায়িত্ব সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের জন্য তিনি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের ওপর থেকে হুথি বিদ্রোহীদের অবৈধ নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ অবসান না হওয়া পর্যন্ত বৈধ সরকারের এই সামরিক অভিযান কোনোভাবেই থামবে না।

 

বৈধ সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কারণেই মূলত হুথিরা রণক্ষেত্রের চাপ কমানোর কৌশল হিসেবে সৌদি আরবের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের প্রাণকেন্দ্রে হামলার পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক সামরিক পর্যবেক্ষক।

 

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সম্প্রতি হুথি বিদ্রোহীদের বেশ কিছু সামরিক অগ্রগতির খবরের পরপরই বৈধ সরকারের পক্ষ থেকে ওই দেশব্যাপী সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী চারটি ভিন্ন নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েজের সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনের সংযোগকারী প্রধান সরবরাহ রুটটি হুথি বিদ্রোহীরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই পথটি সরকারি বাহিনীর রসদ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ওই অঞ্চলে এক নতুন মানবিক ও সামরিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

 

তায়েজে এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিগত কয়েক দিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এই তীব্র লড়াইয়ের পরই ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি ওই অঞ্চলে নিজেদের এই কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

 

হুথিদের এই আকস্মিক অগ্রগতি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে রণক্ষেত্রে আরও বাড়তি চাপে ফেলে দিয়েছে। একদিকে প্রধান সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, অন্যদিকে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র আক্রমণ-সব মিলিয়ে ইয়েমেনের বৈধ সরকার এখন এক বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি।

 

রণাঙ্গনের এই পরিবর্তনশীল ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণেই মূলত দেশটিতে নতুন করে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইয়েমেন সংঘাতের সামগ্রিক উত্তেজনার মাঝে এই নতুন পরিস্থিতি ভূরাজনীতিতে এক ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে।

 

বর্তমানে রাজধানী সানাসহ দেশটির একটি বিশাল অংশ মূলত হুথি বিদ্রোহীদের শক্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের শেষের দিকে হুথিরা যখন রাজধানী সানা দখল করে বৈধ সরকারকে উৎখাত করে, তখন থেকেই ইয়েমেনে এই প্রলম্বিত গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।

 

এরপর ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সরাসরি এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। অপরদিকে, রাজনৈতিক, লজিস্টিক ও সামরিকভাবে হুথি বিদ্রোহীদের সর্বাত্মক সমর্থন জুগিয়ে আসছে আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরান।

 

এর ফলে ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধ কার্যত সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার এক ছায়াযুদ্ধে পরিণত হয়েছে, যার চরম মূল্য চোকাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রলম্বিত ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে এর আগেও হুথি গোষ্ঠী একাধিকবার সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর এবং তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

 

তাদের এই আক্রমণগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানা এবং যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা। এবারের আরামকো স্থাপনায় হামলাও সেই দীর্ঘস্থায়ী ধারাবাহিকতারই একটি অংশ, যা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক অবরোধ ও হামলা সত্ত্বেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এখনও যথেষ্ট হুমকিস্বরূপ এবং তারা সহজেই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে নিজেদের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।

 

দীর্ঘ এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চলা এই সংঘাত কেবল ইয়েমেনের অবকাঠামোই ধ্বংস করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও করুণ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষ আজ চরম দুর্ভিক্ষ, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছে।

 

এর পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ইয়েমেনের অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর। লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির একেবারে সন্নিকটে ইয়েমেন অবস্থিত।

 

এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবাহিত হয়। ফলে ইয়েমেনে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং হুথিদের ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক তৎপরতা কেবল আঞ্চলিক রাজনীতিকেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের নিরাপত্তার ওপরও এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত কোনো টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে।

 

- এএফপি