বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিরকাল ধোঁকা দিতে পারবে না সেন্টকম: আরাগচি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

চিরকাল ধোঁকা দিতে পারবে না সেন্টকম: আরাগচি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের আবহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত সেনাবাহিনী বা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রকৃত সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সুকৌশলে গোপন করছে বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

 

এই তথ্য গোপনের তীব্র সমালোচনা করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, সাধারণ মানুষকে চিরকাল ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তার এই মন্তব্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরকারি বিবৃতিতে এই বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল বার্তা প্রদান করেছেন।

 

তার এই বার্তার মূল ভিত্তি ছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী সংস্থার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। আরাকচি তার বার্তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত মে মাসে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছিল যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী হামলায় অন্তত ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ না কমে বরং আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত সেই মার্কিন সামরিক যানের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৮১টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তবে ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা এই সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বহুগুণ বেশি। এই বিপুল মাত্রার সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।

 

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো যদি সত্যিই সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে এবং সেখানে যদি কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা বিপর্যয় না হয়ে থাকে, তবে কেন মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সেখানে স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না?

 

তিনি অভিযোগ করেন, সেন্টকম তাদের নিজেদের দেশের জনপ্রতিনিধি, এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত দায়িত্বশীল সিনেটরদেরও সেই সামরিক ঘাঁটিগুলো সশরীরে পরিদর্শন এবং সেখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করার ন্যূনতম অনুমতি প্রদান করছে না।

 

মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে দাবি করে আসছে যে তাদের ঘাঁটিগুলোর অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সেখানে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু স্বাধীন পরিদর্শক ও খোদ মার্কিন সিনেটরদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার এই ঘটনা সেন্টকমের সেই স্বাভাবিকতার দাবির সত্যতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 

সামরিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার এই চরম অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সবচেয়ে জোরালো বার্তাটি দিয়েছেন। তিনি সেন্টকম এবং মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কঠোর ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে জোর দিয়ে বলেন, "আপনারা চিরদিন মানুষকে ধোঁকা দিতে পারবেন না।"

 

তার এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচন করার একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ধরনের প্রকাশ্য এবং সরাসরি বিবৃতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তাদের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস এবং সামরিক সক্ষমতারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। মার্কিন কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত পূর্ববর্তী একটি চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই গভীর আলোচনার সূত্রপাত হয়।

 

সেই প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার পর থেকে প্রায় সাত মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপের বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় খোদ মার্কিন বাহিনীকেই চড়া মূল্য চোকাতেও হয়েছে।

 

এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্তত ৮১টি অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক বিমান, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য সামরিক হেলিকপ্টার এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন হয় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, নতুবা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

 

আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন সামরিক বাজেটে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সামরিক অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই বিপুল সংখ্যক আকাশযান ও ড্রোনের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৩৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল্য।

 

এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একক কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে এই পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বিপুল অঙ্কের এই আর্থিক ক্ষতি কেবল মার্কিন কোষাগারেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং তা মার্কিন সাধারণ করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশল নিয়েও দেশটির অভ্যন্তরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি একেকটি ড্রোন এবং সামরিক বিমানের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মেধা বিনিয়োগ করা হয়, তা যখন বিরোধী পক্ষের প্রতিরোধমূলক হামলায় সহজেই অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন তা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অজেয় ভাবমূর্তিতেও একটি বড় ধরনের আঘাত হানে।

 

পরিস্থিতি এখানেই থেমে নেই। চলতি মাসে মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নির্ভরযোগ্য একটি গবেষণা ও জননীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস' বা সিআরএস তাদের ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ক একটি হালনাগাদ ও বিস্তৃত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে।

 

উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত মার্কিন আইনপ্রণেতাদের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য সম্পূর্ণ নির্দলীয়, বস্তুনিষ্ঠ ও গবেষণালব্ধ তথ্য সরবরাহ করে থাকে। সিআরএস-এর প্রকাশিত এই নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে।

 

সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে রণাঙ্গন থেকে নতুন তথ্য ও উপাত্ত প্রকাশিত হলে এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরবর্তী হালনাগাদ সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান, সামরিক হেলিকপ্টার ও ড্রোনের এই সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে আরও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এটি মার্কিন সামরিক প্রশাসনের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সিআরএস-এর মতো একটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের পরোক্ষ স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সামরিক দাবিকেই প্রকারান্তরে সমর্থন জোগাচ্ছে। যখন খোদ মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান নিয়ে প্রকাশ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তখন সেন্টকমের তথ্য গোপন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক প্রমাণের চেষ্টা কার্যত একটি ব্যর্থ ও হাস্যকর প্রয়াসে পরিণত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আধুনিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, উন্মুক্ত তথ্য প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের কারণে যুদ্ধের ময়দানের প্রকৃত চিত্র দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।

 

সেন্টকম হয়তো সাময়িকভাবে মার্কিন জনগণ ও তাদের মিত্রদের মনোবল অটুট রাখার হীন স্বার্থে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিসংখ্যান আড়াল করার মরিয়া চেষ্টা করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের লুকোচুরি ও প্রতারণামূলক নীতি খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

 

সর্বোপরি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচির এই সুদৃঢ়, যৌক্তিক এবং তথ্যভিত্তিক সমালোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে একটি নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুগের যুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনের গোলাগুলিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দানেও বিবদমান পক্ষগুলো সমানে পাল্লা দিচ্ছে।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিপুল অঙ্কের এই আর্থিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান এবং তা অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থ চেষ্টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে কোনো পরাশক্তিই আর এককভাবে অপরাজেয় নয় এবং তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এখন আর পশ্চিমা বিশ্বের হাতে নিরঙ্কুশভাবে কুক্ষিগত নেই।

 

আগামী দিনগুলোতে এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক কৌশল, স্বচ্ছতা ও তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয় কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সমগ্র আন্তর্জাতিক মহল প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে।

 

- পার্সটুডে