যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত এবং আধিপত্যবাদী মন্তব্যের চরম কড়া ও ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার পুনর্জাগরণ নিয়ে রুবিওর দেওয়া বক্তব্যের জবাবে গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা ইরানের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতাকে মুছে ফেলার দুঃস্বপ্ন দেখছে, তাদের চূড়ান্ত পরিণতি হবে চরম অপমানজনক।
ইতিহাসের পাতা থেকে উদাহরণ টেনে তিনি পশ্চিমা শক্তিগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মতো যারা সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখছেন, তাদেরও একসময় রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের মতো ইরানিদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত আটই অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পশ্চিমা বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের তথাকথিত সভ্যতামূলক যাত্রার প্রসঙ্গ টেনে একটি মন্তব্য করেন। ওই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন যে, পশ্চিমা বিশ্ব তার দীর্ঘ ও গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারে এবং হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসে প্রথম যে সভ্যতার আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা পুনরায় প্রজ্বলিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কো রুবিওর এই বক্তব্য নিছকই কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ নয়; বরং এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের চিরচেনা আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা।
সমালোচকরা মনে করেন, সভ্যতার পুনর্জাগরণ এবং গ্রিক দর্শনের আলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এই যে পশ্চিমা বয়ান, তা মূলত স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশগুলোর ওপর নিজেদের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুকৌশলী হাতিয়ার মাত্র।
আধুনিক যুগে এমন মন্তব্যকে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই একটি নতুন রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তারা অন্যান্য সভ্যতাকে নিজেদের অধীনস্থ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কো রুবিওর এই উসকানিমূলক মন্তব্যের পর ইরান চুপ করে থাকেনি। দেশটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টের মাধ্যমে এর কড়া জবাব দেন।
তিনি সরাসরি পশ্চিমা বিশ্বকে লক্ষ্য করে বলেন যে, ইতিহাসজুড়ে ইরানি জাতি এমন অসংখ্য বিদেশি শক্তির মুখোমুখি হয়েছে, যারা নিজেদের মহাবিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি বলে দাবি করত। এই অহংকারী শক্তিগুলো বারবার ইরানের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতাকে চিরতরে মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
তারা এই অঞ্চলে আগুন, যুদ্ধ এবং ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত ধুলোয় মিশে গেছে এবং চরম লজ্জা ও অপমান নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
গালিবাফ তার এই বার্তার মাধ্যমে মূলত ইরানের হাজার বছরের টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতা এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতার বিষয়টিকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
গালিবাফের এই বক্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল তার ঐতিহাসিক উদাহরণ বা রূপকের ব্যবহার। তিনি তার বার্তায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, যারা আজ নতুন করে আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকার অনুসরণ করে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে, তাদের শেষ পরিণতি হবে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের মতো।
এই কথাটির ঐতিহাসিক গভীরতা অনেক। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট একসময় পারস্য সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালিয়েছিলেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেছিলেন।
পশ্চিমা বিশ্ব তাকে একজন মহান বিজেতা হিসেবে সম্মান করলেও, ইরানিদের কাছে তিনি একজন আগ্রাসী আক্রমণকারী হিসেবেই পরিচিত। অন্যদিকে, রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের প্রসঙ্গটি ইরানিদের জাতীয় অহংকারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২৬০ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ঐতিহাসিক এডেসার যুদ্ধে সাসানীয় পারস্যের প্রতাপশালী রাজা প্রথম শাপুরের কাছে চরমভাবে পরাজিত ও বন্দি হয়েছিলেন এই রোমান সম্রাট। বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হওয়া একমাত্র রোমান সম্রাট হিসেবে ভ্যালেরিয়ান পরিচিত।
গালিবাফ এই প্রসঙ্গের অবতারণা করে মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, সামরিক দিক থেকে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ইরানের মাটিতে আগ্রাসন চালাতে এলে তাদেরও ভ্যালেরিয়ানের মতো হাঁটু গেড়ে পরাজয় বরণ করতে হবে।
ইরানের আরেকজন প্রভাবশালী নেতা রেজায়িও সভ্যতার যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে রোমের পরাজয়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার-প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলো সাময়িকভাবে হয়তো কিছু বিজয় অর্জন করেছিল, কিন্তু শেষ বিচারে পশ্চিমা আগ্রাসী শক্তিগুলোর পরিণতি হবে কেবলই পরাজয় এবং চূড়ান্ত অপমান।
আধুনিক যুগে সামরিক প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তির জোরে কোনো প্রাচীন ও শেকড়যুক্ত সভ্যতাকে যে ধ্বংস করা যায় না, সেটিই তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতির বোদ্ধাদের মতে, এই বাগযুদ্ধকে কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক বিবৃতি হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
যখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রাচীন গ্রিসের আগুন পুনরায় জ্বালানোর কথা বলেন, তখন তার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য নিহিত থাকে।
এই ধরনের বয়ান মূলত স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের সেই বিখ্যাত ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্বেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে ভবিষ্যতের বিশ্ব সংঘাতগুলো হবে মূলত ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে।
ওয়াশিংটন এই তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মিত্রদের একত্রিত করার এবং ইরানসহ অন্যান্য স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রগুলোকে একটি ভিন্ন ও বিপজ্জনক সভ্যতার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে এক ধরনের নৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈধতা দেওয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অন্যদিকে, ইরানের জন্য এই ধরনের পশ্চিমা বয়ানের মোকাবিলা করা নতুন কিছু নয়। আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে ইরানিরা সবসময়ই নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত।
তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই ঐতিহাসিক সচেতনতা গভীরভাবে প্রোথিত। মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মন্তব্যের পরতে পরতে সেই ঐতিহাসিক আত্মমর্যাদাবোধের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি যখন বলেন যে আগ্রাসী শক্তিগুলোকে ধুলো আর লজ্জা নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে, তখন তিনি শুধু অতীত ইতিহাসের কথাই বলছেন না, বরং বর্তমান সময়ের ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের চরম ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত করছেন।
গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে এবং অত্যাধুনিক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও যুক্তরাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা নিজেদের অনুগত সরকার ব্যবস্থা কায়েম করতে পারেনি, বরং তাদের ফিরে যেতে হয়েছে একরাশ ব্যর্থতা ও সমালোচনা মাথায় নিয়ে।
গালিবাফ মূলত সেই সাম্প্রতিক লজ্জাজনক ইতিহাসকেই প্রাচীন রোমান সম্রাটের পরাজয়ের রূপকে তুলে ধরেছেন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গালিবাফের এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রধান মিত্র ইসরায়েলের মধ্যে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ এবং প্রকাশ্য শত্রুতা চলমান রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে সামরিক হামলার হুমকি, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে তেহরানকে নিজেদের শর্তাবলি মেনে নিতে বাধ্য করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু গালিবাফসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতাকে কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক কষ্ট বা সামরিক জুজুর ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, পশ্চিমা শক্তির এই দম্ভ অচিরেই ভেঙে পড়বে এবং তাদের বুঝতে হবে যে, শক্তির দম্ভ দেখিয়ে পৃথিবীর সব জাতি বা সভ্যতাকে নিজেদের অধীনস্থ করা যায় না। পশ্চিমা শক্তির এই ধরনের হুমকি, আলটিমেটাম এবং অর্থনৈতিক চাপ মূলত তাদের অতীতের ব্যর্থ সামরিক ও কূটনৈতিক অভিযানগুলোরই একটি হতাশাজনক পুনরাবৃত্তি মাত্র।
সব মিলিয়ে, মার্কো রুবিও এবং মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের এই বাগযুদ্ধ কেবল দুজন রাজনীতিবিদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বা সাময়িক কোনো দ্বন্দ্ব নয়; এটি মূলত দুটি ভিন্ন সভ্যতা, দুটি ভিন্ন মতাদর্শ এবং বিশ্ব রাজনীতির দুটি বিপরীত মেরুর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করে বিশ্বব্যাপী নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও মোড়লগিরি বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান তাদের প্রাচীন পারস্য সভ্যতার অহংকার এবং প্রতিরোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই সভ্যতাকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত গালিবাফের এই কড়া জবাব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল যে, ইতিহাস এবং সভ্যতার লড়াইয়ে ইরান পরাশক্তির কাছে মাথা নত করতে মোটেও প্রস্তুত নয়।