বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় এক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই সমস্যাটি ক্রমশ একটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।

 

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, দেশজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী দিনগুলোতে একটি বিশাল স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

চলমান জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের পনেরোতম দিনে বৃহস্পতিবার সকালে এক লিখিত প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এদিন সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

 

সংসদীয় কার্যপ্রণালী অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর টেবিলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়। মূলত ফেনী-দুই আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

তিনি তার প্রশ্নে স্পষ্টভাবে জানতে চান, দেশে ভয়াবহ হারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বাড়ছে কি না এবং এই দাবি সত্য হলে, দেশে দ্রুত ও কার্যকরভাবে এসব জীবাণু শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক কিট তৈরির বা সরবরাহ বৃদ্ধির কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে কি না।

 

সংসদ সদস্যের এই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই জানান যে, দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির খবরটি সম্পূর্ণ সত্য।

 

এই পরিস্থিতিকে একটি ক্রমবর্ধমান ও গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এর পেছনের বেশ কিছু মূল কারণ তুলে ধরেন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের উপযুক্ত পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার এবং এর মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

 

এর পাশাপাশি দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে যথাযথ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কথাও তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কেবল মানবদেহেই নয়, পশুচিকিৎসা ও কৃষি খাতেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের ব্যাপক ও সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে।

 

এসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী শক্তিশালী জীবাণু খুব সহজেই আমাদের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসাও দিনে দিনে অত্যন্ত কঠিন ও জটিল হয়ে উঠছে।

 

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে এই আসন্ন সংকট মোকাবিলায় সরকার বসে নেই বলেও জাতিকে আশ্বস্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বিস্তারিতভাবে জানান যে, জীবাণু শনাক্তকরণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নির্ণয়ের জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো একটি যুগোপযোগী জাতীয় কর্মপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। মূলত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে মানব স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ খাতে একটি অত্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

এর মাধ্যমে সব খাতেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইলেন্স বা নিবিড় নজরদারি কার্যক্রম দেশব্যাপী নিপুণভাবে পরিচালনা ও আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

 

চিকিৎসা অবকাঠামোগত অভাবনীয় উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে আরও জানান যে, দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ও বিশ্বমানের মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি স্থাপনের কাজ চলছে।

 

একই সাথে বিদ্যমান ল্যাবগুলোর আধুনিকায়নের কাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে। এসব আধুনিক পরীক্ষাগারে জীবাণু শনাক্তকরণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সংবেদনশীলতা পরীক্ষা পরিচালনার সক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

 

ল্যাবরেটরিগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত মানের রিএজেন্ট বা রাসায়নিক উপাদান সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া, যারা এসব সংবেদনশীল ল্যাবে কাজ করবেন, সেই সব চিকিৎসাকর্মী ও টেকনিশিয়ানদের পেশাগত উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

 

সবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান যে, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সর্বস্তরে জোরদার করার পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের কাজ অবিরাম চলছে।

 

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ভবিষ্যৎ প্রবণতা, এর পেছনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিরূপণের জন্য সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের এসব কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণ ওষুধের দোকান থেকে বিনা প্রেসক্রিপশনে এবং যথেচ্ছাভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয় ও সেবন রোধে দেশজুড়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।

 

এই ধরনের সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী জীবাণুর দ্রুত শনাক্তকরণ, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আগামীতে আরও শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।