বুধবার, ২৪ জুন দুপুরে স্থানীয় ওই এলাকা থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। মর্মান্তিক ও অমানবিক এই ঘটনার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার ফলশ্রুতিতে ওই রেস্তোরাঁয় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
একটি প্রথম শ্রেণির নিষ্পাপ শিশুর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার চরম অবক্ষয় এবং শিশুদের জন্য এক অনিরাপদ পারিপার্শ্বিক অবস্থার চিত্রকেই যেন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বুধবার বেলা এগারোটার দিকে ভেড়ামারা এলাকার অত্যন্ত পরিচিত খাবারের দোকান ‘জাফলং চাইনিজ ফাস্টফুড’ নামক রেস্তোরাঁয় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও পাশবিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়।
ভুক্তভোগী শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ মালিকের নাম আমির উদ্দিন, যার বয়স চল্লিশ বছর বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ঘটনার দিন সকালে ওই অবুঝ শিশুটিকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজের রেস্তোরাঁর ভেতরে নিয়ে যান ওই ব্যক্তি।
এরপর সেখানেই তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জোরালো অভিযোগ করেছেন। ঘটনাটি কোনোভাবে জানাজানি হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুটির এমন করুণ পরিণতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী এবং দ্রুতই ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন শত শত সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে এ ধরনের সামাজিক অস্থিরতার খবরে যেমনটা দেখা যায়, ঠিক তেমনই জনরোষের এক চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভেড়ামারা ব্রিজ এলাকায়।
ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ মালিক আমির উদ্দিনকে হাতেনাতে আটক করে ফেলেন। ক্ষুব্ধ জনতার রোষানল থেকে তিনি কোনোভাবেই রক্ষা পাননি; উপস্থিত মানুষ তাকে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর শুরু করেন।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, আইন নিজেদের হাতে তুলে নেন স্থানীয়রা। অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অবিরাম স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি উত্তেজিত জনতার একাংশ ওই ‘জাফলং চাইনিজ ফাস্টফুড’ রেস্তোরাঁটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালান এবং একপর্যায়ে সেখানে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ করেন।
আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তের মধ্যেই পুরো রেস্তোরাঁটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জনরোষের কারণে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে এক ভয়াবহ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতার এমন রোষানল, মারধর ও অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে গাইবান্ধা সদর থানা পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তারা উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার উদ্যোগ নেন এবং বিক্ষুব্ধ মানুষের হাত থেকে অভিযুক্ত আমির উদ্দিনকে উদ্ধার করে নিজেদের আইনি হেফাজতে নিতে সক্ষম হন।
এরপর তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সরাসরি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে, চরম শারীরিক ও মানসিক আঘাতের শিকার হওয়া ওই ছয় বছরের অবুঝ শিশুটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে শিশুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। পুরো ঘটনা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) শেখ মুত্তাজুল ইসলাম উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেছেন।
তিনি গণমাধ্যমকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এবং উত্তেজিত জনতার হাত থেকে অভিযুক্তকে অত্যন্ত সাবধানে উদ্ধার করে আইনি হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়।
তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, ভুক্তভোগী শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য এবং ধর্ষণের ফরেনসিক আলামত সংগ্রহের নিমিত্তে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই জঘন্য অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবারের লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় রয়েছে এবং অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রচলিত কঠোর আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেছেন।
বর্তমানে পুরো ভেড়ামারা ব্রিজ এলাকাজুড়ে একধরনের থমথমে ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, দাঙ্গা বা পুনরায় সহিংসতা এড়াতে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজরদারি রাখছে এবং স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে অবুঝ শিশুদের ওপর এমন বর্বরোচিত যৌন নির্যাতনের অভিযোগ বারবার আমাদের সমাজব্যবস্থার সুরক্ষা বলয় নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে ধরছে।
সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এ ধরনের জঘন্য অপরাধের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অপরাধী যেই হোক না কেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে তাকে আইনের কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনার দাবি এখন সর্বমহলের।