মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে কলেজছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, গৃহশিক্ষক গ্রেপ্তার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম

রংপুরে হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে কলেজছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, গৃহশিক্ষক গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরীর একটি সুপরিচিত আবাসিক হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে নুজশাত জাহান নামের এক তরুণী কলেজছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

এই আত্মহত্যার ঘটনায় সরাসরি প্ররোচনা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিন নামের এক যুবককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। নিহত নুজশাত জাহান রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।

 

ঘটনার আকস্মিকতায় নিহতের পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝেও গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত শাহরিয়ার আহম্মেদ নগরীর ধাপ চিকলি ভাটা এলাকার ফোরকান আলীর ছেলে এবং তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী।

 

রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম নাজমুল কাদের গত মঙ্গলবার বিকেলে গণমাধ্যমের কাছে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

পুলিশ তাদের প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত করেছে যে, অভিযুক্ত শাহরিয়ার নিহত কলেজছাত্রী নুজশাতের গৃহশিক্ষক ছিলেন এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি গভীর প্রেমের সম্পর্ক চলমান ছিল।

 

নিহত ছাত্রীর বাবা তাঁর মেয়ের এই অকাল মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে ওই গৃহশিক্ষকসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা প্ররোচনা মামলা দায়ের করেছেন।

 

ওই মামলার এজাহারের ভিত্তিতেই ঘটনার সার্বিক দিক খতিয়ে দেখার জন্য প্রথমে শাহরিয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

 

নিহত ছাত্রীর শোকসন্তপ্ত মা আফসানা পারভীন জানান, তাঁর মেয়ে প্রতিদিনের মতো প্রাইভেট পড়ার কথা বলেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু কখন, কীভাবে এবং কেন তিনি ওই হোটেলের ছাদে গেলেন, সে বিষয়ে পরিবারের কেউ কিছুই জানেন না।

 

তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, নিহতের বাবা গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকজন অজ্ঞাত যুবক তাদের বাড়ির আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল।

 

পরবর্তীতে পুলিশের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ওই আবাসিক হোটেলের সামনে গিয়ে মেয়ের নিথর দেহ শনাক্ত করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি তাঁর মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির মেসেজসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলা অবস্থায় দেখতে পান।

 

সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও চিত্র দেখার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর মেয়েকে মোবাইল ফোনে কথা বলার পর রেলিংয়ের কাছে গিয়ে বসতে দেখা যায়। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ওই গৃহশিক্ষকের ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েই নুজশাত এমন চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

 

তবে পুলিশের কাছে আটকের পর অভিযুক্ত শাহরিয়ার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, নিহত ওই ছাত্রী তাঁর কাছে একটি ছোট ব্যাচে প্রাইভেট পড়তেন এবং একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী তাঁর প্রতি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

 

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি তাকে ওই ব্যাচ থেকে আলাদা করে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্রীর মায়ের বিশেষ অনুরোধে বাধ্য হয়ে পুনরায় তাকে পড়ানো শুরু করেন।

 

শাহরিয়ারের দাবি, ওই ছাত্রী নানা ধরনের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা জানিয়ে তাকে ক্রমাগত মেসেজ করতেন এবং কল করতেন, যার কারণে বিরক্ত হয়ে তিনি ফোন নম্বরটি ব্লক করে দেন। এই মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা নেই বলে তিনি দাবি করেছেন।

 

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে পুলিশ ইতিমধ্যে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে।

 

তদন্তে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, গত প্রায় আট থেকে নয় মাস ধরে ওই ছাত্রীর সঙ্গে অভিযুক্ত শাহরিয়ারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এমনকি ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নুজশাতের সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল।

 

ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ঘটনার দিন বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে নুজশাত বাইরে থেকে এসে সোজা ওই হোটেলটির নয় তলা ভবনের ছাদে চলে যান। সেখানে তিনি প্রায় এক ঘণ্টা একাকী অবস্থান করেন এবং ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলেন।

 

এরপর বিকেল পাঁচটা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিটে তিনি ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসেন এবং একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। দুর্ঘটনার ওই ভিডিও চিত্রটি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়।

 

আত্মহত্যার মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই মেয়েটি রেলিংয়ে ওঠার আগে নিজের মোবাইল ফোন ও পায়ের স্যান্ডেল নির্দিষ্ট স্থানে খুলে রেখেছিলেন। এটি একটি সুস্পষ্ট আত্মহত্যার চেষ্টার দিকেই জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করে।

 

তিনি আরও জানান, পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মেয়েটির শারীরিক ভাষায় একধরনের মানসিক অস্থিরতা এবং বেঁচে থাকার অবচেতন চেষ্টাও লক্ষ করা গেছে। এসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রমাণ করে যে, ঘটনার সময় তার মানসিক স্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক ছিল না।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষের চরম নিরাপত্তা গাফিলতি নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় সংবাদকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ওই হোটেলের কোনো কক্ষে মেয়েটির বুকিং না থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বিনা বাধায় সোজা ছাদে প্রবেশ করলেন।

 

শুধু ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রকাশ করা হলেও হোটেলে প্রবেশ বা সিঁড়ি ব্যবহারের কোনো ভিডিও চিত্র কেন সরবরাহ করা হলো না, সেটি একটি বড় রহস্য। এছাড়া মৃত্যুর পরপরই তাঁর মোবাইল ফোনের সব তথ্য কারা মুছে দিল, তা নিয়েও জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

 

পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের মুছে ফেলা তথ্য পুনরুদ্ধার, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই খুব শিগগিরই এই মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত রহস্য সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করা সম্ভব হবে।