মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কিনা তা আদালত নির্ধারণ করবে- তথ্য উপদেষ্টা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কিনা তা আদালত নির্ধারণ করবে- তথ্য উপদেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবর্তিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।

 

দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমানে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থগিত থাকলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

 

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই রাষ্ট্রীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিগত বছরগুলোতে দলটির বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

 

মঙ্গলবার রাজধানীর সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সরকারের নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় তথ্য উপদেষ্টা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

সরকারের নীতিনির্ধারণী অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বিস্তারিতভাবে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার যে গুরুতর ও ঐতিহাসিক অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে, তার বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।

 

এই বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন দলটির সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর সুনির্দিষ্ট ধারার আওতায় সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।

 

উপদেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যেহেতু বর্তমানে তাদের সব ধরনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাই এই মুহূর্তে দলটি যদি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সমাবেশের নামে রাজপথে নামার চেষ্টা করে, তবে তা সরাসরি দেশের প্রচলিত আইন ভঙ্গের শামিল বলে গণ্য হবে।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সরকার জননিরাপত্তা রক্ষার্থে স্বাভাবিকভাবেই সেই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত শাণিত ও সমালোচনামুখর বক্তব্য প্রদান করেন।

 

তিনি মনে করেন, এই দলটির বর্তমানে রাজপথে কোনো কর্মসূচি বা আন্দোলন বাস্তবায়ন করার মতো ন্যূনতম নৈতিক সাহস অবশিষ্ট নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যারা দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনগণের অধিকার হরণ করেছে, তাদের ভেতরে কোনো আত্মিক বা নৈতিক শক্তি থাকতে পারে না।

 

একটি সুপরিচিত দেশীয় প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের দম্ভ তখনই প্রকাশ পায়, যখন সাধারণ মানুষ তাদের অতীত ভুলে যায়। জাতির সামষ্টিক স্মৃতিভ্রংশ না হলে বা দেশের সব মানুষের স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, এই দলটির পক্ষে পুনরায় জনগণের সামনে এসে উচ্চকণ্ঠে কথা বলার কোনো নৈতিক সুযোগ নেই বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্রের জন্য আদৌ ইতিবাচক ফল বয়ে আনে কি না-সাংবাদিকদের এমন একটি গভীর তাত্ত্বিক ও গঠনমূলক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোতে যেকোনো রাজনৈতিক দলকে সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, মাত্র কয়েক দিন আগেই বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে মন্তব্য করেছিলেন-আওয়ামী লীগ এখন আর কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বা দেশীয় পরিভাষায় মাফিয়া গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

 

দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এই একই কথা বিশ্বাস করে আসছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান। আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বাস্তব উদাহরণ টেনে তিনি ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র জার্মানির একটি রাজনৈতিক দলের কথা উল্লেখ করেন।

 

তিনি বলেন, সেই দলটি সে দেশের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট এবং আসন পাওয়া সত্ত্বেও কেবল গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় না রাখার কারণে বর্তমানে নিষিদ্ধ হওয়ার প্রবল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

 

জনসমর্থনের বিষয়টি আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অনেকেই দেশের ভেতরে এবং বাইরে এই যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, আওয়ামী লীগের প্রতি দেশের একটি বড় অংশের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন রয়েছে।

 

কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেবল জনসমর্থন থাকলেই কি কোনো দল রাষ্ট্রের নিয়মনীতি অগ্রাহ্য করে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে? এই বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি কোনো চরমপন্থি বা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি দেশের অর্ধেক মানুষেরও সমর্থন থাকে, তবুও রাষ্ট্র তাদের অবাধে সমাজবিধ্বংসী কার্যক্রম চালানোর আইনি অনুমতি দিতে পারে না।

 

কারণ, একটি কার্যকর ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত, রূপরেখা ও মৌলিক নিয়মের প্রতি শর্তহীনভাবে শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রীর এই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দলটির জনসমর্থনের মাত্রা যেমনই হোক না কেন, তাদের স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের স্বাধীন আইনি এখতিয়ারভুক্ত একটি বিষয়।

 

বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালত যে চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে, সরকার সেই রায়কেই বিনম্র চিত্তে মেনে নেবে।