সোমবার, ২২ জুন সম্পূর্ণ প্রকাশ্য ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে এই দানবাক্সগুলোর অর্থ গণনার কাজ সম্পন্ন হয়। আনুষ্ঠানিক এই গণনায় সর্বমোট সতেরো লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পাঁচশত ঊনপঞ্চাশ টাকা নগদ অর্থ পাওয়া গেছে।
ধর্মপ্রাণ মানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মাজারের তহবিলে জমা পড়েছে, যা প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত সিলেটের এই ঐতিহাসিক মাজারে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে, যাঁদের ঐকান্তিক অনুদানের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি এই চার দিনের সংগৃহীত অর্থ।
সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াকফ কর্মকর্তা সজল মিয়া গণমাধ্যমকে এই আর্থিক হিসাবের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, সিলেট জেলা প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে গঠিত একটি বিশেষ তদারকি কমিটির মাধ্যমে মাজার প্রাঙ্গণে থাকা দানবাক্সগুলো গত ১৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে সিলগালা করা হয়েছিল।
মূলত মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
এরপর সোমবার পবিত্র জোহরের নামাজের পর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও উপস্থিত শত শত সাধারণ মানুষের সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে সেই সিলগালা করা দানবাক্সগুলো খোলা হয় এবং অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক গণনা কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এই ধরনের উন্মুক্ত গণনা প্রক্রিয়া জনমনে প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এই দীর্ঘ ও সতর্কতামূলক গণনা কার্যক্রমে সিলেট জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
ওয়াকফ কর্মকর্তা সজল মিয়া আরও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে জানান যে, মাজার প্রাঙ্গণে আগে থেকেই চারটি পুরোনো দানবাক্স সংরক্ষিত ছিল। এর পাশাপাশি, জেলা প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ দ্বৈত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ডাবল লক সংবলিত আরও চারটি আধুনিক ও সুরক্ষিত নতুন দানবাক্স সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল।
সর্বমোট এই আটটি দানবাক্স থেকেই নগদ অর্থের পাশাপাশি বেশ কিছু মূল্যবান সামগ্রী ও বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। নগদ সতেরো লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পাঁচশত ঊনপঞ্চাশ টাকার পাশাপাশি দানবাক্সগুলোতে পুণ্যার্থীদের দেওয়া সাত আনা ওজনের স্বর্ণালংকার এবং পবিত্র ভূমি থেকে আগত প্রবাসী ও দর্শনার্থীদের দেওয়া বেশ কিছু সৌদি রিয়ালও পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা ও মূল্যবান সম্পদ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের সিলেট কর্পোরেট শাখায় মাজারের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা প্রদান করা হবে।
এই অর্থ পরবর্তীতে মাজারের সার্বিক উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর রক্ষণাবেক্ষণ এবং এতদসংলগ্ন বিশাল এতিমখানা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনকল্যাণমূলক কাজে অত্যন্ত সুচারুরূপে ব্যবহৃত হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সময় সদ্য প্রত্যাহারকৃত সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সোমবার দুপুরে ঐতিহাসিক এই দরগাহ মসজিদে উপস্থিত হয়ে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে অত্যন্ত বিনম্র পরিবেশে জোহরের নামাজ আদায় করেন।
নামাজ শেষে তিনি মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত জামেয়া ও এতিমখানা কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। মূলত তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান, দিকনির্দেশনা ও নিবিড় নজরদারির আলোকেই দানবাক্সগুলো খোলা এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে টাকা গণনার এই বিশাল কার্যক্রমটি অত্যন্ত সফল ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রশাসনিক এই পদক্ষেপ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি সিলেটের সাধারণ জনগণ, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং মাজারের অগণিত ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আধ্যাত্মিক এই প্রখ্যাত সাধকের প্রতি মানুষের গভীর ভক্তি ও অনুরাগের যে অনন্য প্রতিফলন এই দানের মাধ্যমে ফুটে ওঠে, তার সঠিক ও জনকল্যাণমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই ধরনের নজরদারি ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে স্থানীয় সুধীসমাজ গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ড অনুযায়ী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, অনুকরণীয় এবং ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।