একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ জ্বালানি খাতে যৌথ বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সোমবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বর্তমান গতিপ্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি দূরদর্শী ও লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে উভয় দেশই তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
দ্বিমুখী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথ আরও প্রসারিত করতে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদ’ গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের শীর্ষ নেতা। এর মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো উচ্চমূল্যের খাতগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
গ্লোবাল হালাল বাজারের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
এছাড়া উভয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ এবং এ সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সরাসরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের তরফ থেকে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বঙ্গোপসাগরে খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কয়লা সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সুশাসনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি খাতেও যৌথ বিনিয়োগ ও জ্ঞান বিনিময়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ, স্বচ্ছ ও লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ‘যৌথ কার্যনির্বাহী গ্রুপ’ গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। এই গ্রুপটি মূলত শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে কাজ করবে।
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের সীমাবদ্ধতাগুলো মূল্যায়ন করে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে একটি যুগোপযোগী চুক্তি প্রণয়নই হবে এর প্রধান লক্ষ্য। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগকর্তাদের যাচাইকৃত চাহিদার ভিত্তিতে নতুন কর্মীর কোটা মূল্যায়ন করা হবে।
এক্ষেত্রে কেবল বৈধ ও নির্ভরযোগ্য নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমেই কর্মী নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কারিগরি শিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর বিষয়েও উভয় নেতা ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বাইরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পারস্পরিক আসন বরাদ্দ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিনিময় বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত যৌথ কমিশনের বৈঠক পুনরায় শুরু করার পাশাপাশি বাংলাদেশের আসিয়ানের আঞ্চলিক সংলাপ অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবে মালয়েশিয়া পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে অভিন্ন অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।