সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় রাতের বেলায় আকস্মিক ভূমিকম্প

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

ঢাকায় রাতের বেলায় আকস্মিক ভূমিকম্প
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ এর আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আকস্মিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সোমবার, ২২ জুন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এই অপ্রত্যাশিত ভূকম্পন সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে দেয়।

 

প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাত ঠিক ৯টা ২৯ মিনিট ২০ সেকেন্ডের সময় ভূত্বকের এই কম্পন অনুভূত হয়। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতের বেলা যখন অধিকাংশ মানুষ নিজেদের বাসগৃহে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পদধ্বনি নগরবাসীকে গভীরভাবে বিচলিত করে তোলে।

 

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভূমিকম্পের ফলে এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা বা দেশের অন্য কোথাও থেকে কোনো ধরনের ভবন ধস, প্রাণহানি কিংবা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কোনো সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া যায়নি।

 

আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউরোপীয় ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভূমিকম্পের তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রিখটার স্কেলে এই ভূকম্পনের মাত্রা ঠিক কত ছিল, ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা কতটুকু এবং এর সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্র কোথায় অবস্থিত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

 

পাশাপাশি বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর বা জাতীয় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত এই ভূমিকম্পের মাত্রা বা কেন্দ্র সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের জন্য নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আকস্মিক এই কম্পনের ফলে বহুতল ভবনগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ নাগরিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

 

কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার পরপরই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহু মানুষ সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসেন এবং শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থানে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন।

 

ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষজন ধীরে ধীরে নিজেদের বাসগৃহে ফিরতে শুরু করলেও তাদের মনে এক ধরনের চাপা ভীতি বিরাজ করছিল।

 

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ভূমিকম্পের খবর মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে এবং নাগরিকরা নিজেদের ও পরিজনদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘন ঘন মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ভীতির সঞ্চার হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে, গত ১২ জুন সিলেট ও ময়মনসিংহসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে অনুরূপ মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।

 

রিখটার স্কেলে সেই ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৪ দশমিক ৫ মাত্রা। পরপর এমন ভূকম্পনের ঘটনা দেশের ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এবং জনসাধারণকে বড় কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কায় চিন্তিত করে তুলেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট এই কম্পনগুলো ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূমিকম্পের সুস্পষ্ট পূর্বাভাস হতে পারে, তাই জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন।

 

ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, টেকটনিক পাতের সক্রিয় সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলে যেকোনো সময় শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূকম্পনের তীব্র আশঙ্কা সব সময়ই বিরাজমান।

 

বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো এই ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মাটির নিচের এই টেকটনিক পাতগুলোর অনবরত সংঘর্ষ ও স্থানচ্যুতির ফলেই মূলত এই ধরনের ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়, যা প্রাকৃতিক নিয়মের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও মানবসভ্যতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

 

রাজধানী ঢাকার মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একটি মেগাসিটির জন্য এই ধরনের ভূকম্পন গভীর উদ্বেগের বিষয়। নগরায়ণের তীব্র প্রতিযোগিতায় রাজধানী ও এর আশপাশের শহরগুলোতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

 

শহরের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অসংখ্য বহুতল ভবন, অপর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান এবং অত্যন্ত সরু রাস্তাঘাট বড় ধরনের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বারবার গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন।

 

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে কাঠামোগত সংস্কার বা শক্তিবৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো বড় বিপর্যয়ে লাখো মানুষের প্রাণহানি এবং দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার মতো সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

 

ভূমিকম্প এমন একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আগাম কোনো পূর্বাভাস দেওয়া বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় সুদৃঢ় পূর্বপ্রস্তুতি এবং জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত পূর্বপ্রস্তুতিমূলক মহড়া আয়োজনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন।

 

ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি না করে, ভবনের ভেতরে থাকলে মজবুত আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং সুযোগ পেলে দ্রুত খোলা ও নিরাপদ স্থানে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

সার্বিকভাবে, সোমবার রাতের এই আকস্মিক ভূকম্পন সমগ্র জাতিকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে প্রাকৃতিক শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায় এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি আরও কতটা সুসংহত হওয়া প্রয়োজন।

 

সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে সম্মিলিতভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আপাতত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরলেও, ভবিষ্যতের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।