মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

চীনের জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সার্বিক আধুনিকায়ন এবং দেশের বিস্তীর্ণ আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ চূড়ান্ত রূপ পেতে চলেছে।

 

জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একবিংশ শতাব্দীর বহুমাত্রিক সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে তুলতে চীনের তৈরি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ২০টি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়াটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চীন সফরে এই বৃহৎ প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত আলোচনা বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই আনুষ্ঠানিক সফরকালে চীনের শীর্ষ নেতা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে হস্তান্তরের কৌশলগত দিক নিয়ে বিশদ ও ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।

 

রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করছে বর্তমান সরকার।

 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই মূলত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে চীনের কাছ থেকে এই আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো ক্রয়ের নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা স্বার্থে এই সিদ্ধান্তটি সচল রেখেছে।

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের আকাশসীমার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সুবিশাল সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুরক্ষায় বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

বর্তমানে বিমানবাহিনীর বহরে থাকা অত্যন্ত পুরনো মডেলের এফ-৭ এবং স্বল্পসংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানগুলো পরিবর্তন করে একটি অত্যাধুনিক, বহুমুখী ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

আর সেই শূন্যস্থান পূরণে এবং আকাশযুদ্ধের আধুনিক সমীকরণে টিকে থাকতে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানগুলোকে সবচেয়ে যুগোপযোগী, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

 

সরকারের দায়িত্বশীল উচ্চপর্যায় থেকে এই ক্রয়প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাঠামোগত প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, চীন থেকে জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি ও আর্থিক দিক নিয়ে নিবিড় আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই চলমান চীন সফরে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পেলেও এই সফরেই চূড়ান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না, বরং দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশনের পর্যায়টি আরও সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ হবে।

 

তবে সব কিছু ঠিক থাকলে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে সরকার জোরালো প্রত্যাশা করছে। এর আগে, গত শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিভিন্ন দিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়।

 

সেখানে সামরিক কেনাকাটা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম একটি বাস্তবসম্মত ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী সামরিক সরঞ্জামের ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত মূল আলোচনাগুলো সাধারণত কৌশলগত বা অপারেটিভ পর্যায়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক বৈঠকে সরাসরি এই বিষয়ে চুক্তি হয় না।

 

তবে সামরিক খাতে বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও গভীর আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, সেটি আরও জোরদার করার বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ে অবশ্যই ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

 

প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়নের এই বৃহৎ ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটির জন্য প্রায় পনেরো হাজার কোটি টাকার বেশি বিশাল বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

 

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

দেশের প্রথিতযশা নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির এই বলিষ্ঠ উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিনি গণমাধ্যমের কাছে তার বিশ্লেষণী মতামত তুলে ধরে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান সমরাস্ত্র ভাণ্ডারে যেসব যুদ্ধবিমান সক্রিয় রয়েছে, সেগুলো কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেকটাই সেকেলে হয়ে পড়েছে এবং আধুনিক আকাশযুদ্ধের জন্য খুব একটা উপযুক্ত নয়।

 

বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করলে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও শক্তিশালী বিমানবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই।

 

তাই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র চীন থেকে এই উন্নত প্রযুক্তির জঙ্গিবিমান সংগ্রহের যে নিবিড় আলোচনা চলছে, তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োচিত একটি পদক্ষেপ বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

 

বৈশ্বিক সামরিক পরিমণ্ডল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানটি বর্তমানে ব্যাপক আলোচিত ও সমাদৃত একটি নাম। এটি মূলত চীনের নিজস্ব বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী জে-১০সি মডেলের অত্যাধুনিক রপ্তানি সংস্করণ, যা আধুনিক রাডার সিস্টেম ও মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহলের তথ্যমতে, গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এক উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী এই জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিল।

 

এমনকি তারা এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে ভারতের বহুল আলোচিত একাধিক ফরাসি রাফায়েল যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার জোরালো দাবি করেছিল। এই যুগান্তকারী ঘটনার পর থেকেই জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষামূলক কার্যকারিতা সারা বিশ্বের সমরবিদ ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

 

প্রসঙ্গত, বিগত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য উন্নতমানের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল।

 

মূলত ২০১৬ সাল থেকেই ফ্রান্সের তৈরি রাফায়েল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্রযুক্তির ইউরো ফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের মধ্যে যেকোনো একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বেছে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছিল।

 

এমনকি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশকে রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

 

কিন্তু বিগত সরকারের আমলে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক সংকট, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তলানিতে নেমে যাওয়ায় সেই সময় এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্রয়ের আলোচনাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

 

তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পরাশক্তি চীনের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন।