বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যক্রমে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত প্রদানের সুযোগ নিয়ে তিনি এই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁর এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে সম্প্রতি জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত তরুণ নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করে বলা হয়েছিল যে, তাঁরা অতীতে রিকশায় যাতায়াত করতেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি আসার পর এখন বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন।
এই ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে মূলত তাদের সততা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সরকারের একজন দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী ব্যক্তির মুখ থেকে আসা এমন ইঙ্গিতপূর্ণ ও অবমাননাকর বক্তব্যের জবাবে হাসনাত আব্দুল্লাহ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি মনে করেন, এ ধরনের মন্তব্য কেবল ব্যক্তি হাসনাত আব্দুল্লাহর জন্য নয়, বরং জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে আসা নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি চরম অবমাননাকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অধিবেশনে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের চোর-তাড়ানি সুরে কথা বলা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সংসদীয় শিষ্টাচারবহির্ভূত।
তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যেন কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে ঢালাওভাবে মহান সংসদে উপস্থাপন করা না হয়। এর পরিবর্তে তিনি সরকারের অধীনস্থ সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও সুষ্ঠু তদন্তের উদাত্ত আহ্বান জানান।
হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা সামরিক ও বেসামরিক সকল গোয়েন্দা সংস্থা, যেমন-ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), বাংলাদেশ পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্যবহার করে যেন তাঁদের বর্তমান জীবনযাপন ও সম্পদের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়।
এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, যদি এই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত ও নিরপেক্ষ তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে মাত্র এক টাকারও দুর্নীতি কিংবা বিন্দুমাত্র অসদুপায় অবলম্বনের কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তিনি কালক্ষেপণ না করে এই মহান জাতীয় সংসদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।
তাঁর এই সাহসী ও আপসহীন বক্তব্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে উপস্থিত সবার মনোযোগ গভীরভাবে আকর্ষণ করে। এর পাশাপাশি, সংসদে দেওয়া তাঁর পূর্ববর্তী একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যার বিষয়েও তিনি এদিন আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণ প্রদান করেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, তাঁর আগের বক্তব্যে তাঁর নাম উল্লেখ করে কিছু ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পরিষ্কার করে দেন যে, তিনি তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্যের কোনো পর্যায়েই এমন কোনো শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেননি যেখানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য কোনো বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত না করার আবেদন জানিয়েছেন।
তিনি মূলত একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর এলাকার সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে কেবল এইটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, সংসদে দেওয়া তাঁর কোনো স্পষ্টবাদী ও সরকারের সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে যেন কোনোভাবেই তাঁর নির্বাচনী এলাকার সাধারণ জনগণ তাদের ন্যায্য রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম থেকে বঞ্চনার শিকার না হন।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের স্বার্থ রক্ষাই যে তাঁর প্রধান লক্ষ্য, সেটিই তিনি পুনরায় ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদের ভেতরে এ ধরনের গঠনমূলক বিতর্ক এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের সততা প্রমাণের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।
জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের এই রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে কতটা সংবেদনশীল এবং নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণে কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, হাসনাত আব্দুল্লাহর এই বক্তব্য তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে আসা রাজনৈতিক আক্রমণাত্মক বক্তব্যের বিপরীতে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই সরাসরি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্তের এই প্রকাশ্য আহ্বান বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য, সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।