চার দিনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও সফল সরকারি সফর শেষে স্বদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘বিজি-৩৭৭’ ফ্লাইটে এই অনাকাঙ্ক্ষিত যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে।
রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও ভিভিআইপি যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে উড্ডয়ন প্রক্রিয়া বাতিল করার মতো অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে দেশের গণমাধ্যমগুলোকে এই বিলম্বের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বা বেসামরিক বিমান চলাচলের বৈশ্বিক নিয়মাবলি অনুযায়ী, যেকোনো ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সামান্যতম ঝুঁকি গ্রহণ করার কোনো আইনগত বা ব্যবহারিক সুযোগ নেই, আর ঠিক সেই কঠোর প্রটোকল মেনেই এই উড্ডয়ন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
ফ্লাইটে থাকা যাত্রীদের প্রত্যক্ষ বর্ণনা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। সূত্রমতে, নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের ফ্লাইটে আরোহণের প্রক্রিয়া বা বোর্ডিং সম্পূর্ণ করা হয়েছিল।
ভিভিআইপি যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি ও প্রটোকল শেষে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে টার্মিনাল ভবন থেকে রানওয়ের দিকে পুশব্যাক বা পেছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কাজও অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।
উড্ডয়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য যখন বিশালাকার উড়োজাহাজটি রানওয়ের দিকে ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে ককপিটে থাকা মূল পাইলটের আধুনিক কন্ট্রোল প্যানেলে একটি সতর্কতামূলক ইলেকট্রনিক সংকেত বেজে ওঠে।
উড়োজাহাজের গতি নিয়ন্ত্রণকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এরোডাইনামিক অংশ ‘স্পয়লার’-এ কোনো এক ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে ওই সংকেতে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হচ্ছিল। স্পয়লার মূলত উড়োজাহাজের ডানার ওপরের দিকে থাকা একটি চলনশীল ফ্ল্যাপ-সদৃশ অংশ, যা আকাশে থাকা অবস্থায় বাতাসে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে উড়োজাহাজের গতি কমাতে এবং বিশেষ করে রানওয়েতে অবতরণের সময় উড়োজাহাজটিকে মাটির সঙ্গে চেপে রেখে সঠিক ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উড্ডয়নের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ককপিটে এমন একটি সংবেদনশীল ত্রুটির সংকেত পাওয়ার পর উড়োজাহাজের অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন বিন্দুমাত্র সময়ক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে টেক-অফ বা উড্ডয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
এরপর তিনি নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে দ্রুত জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করে উড়োজাহাজটিকে পুনরায় নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় বা সুরক্ষিত বে-তে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর পরই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব প্রকৌশল দল এবং এয়ার ক্রুরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত দ্রুত এবং পেশাদার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ সংবাদমাধ্যমের কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য অবহিত করতে গিয়ে জানান যে, উড়োজাহাজটির স্পয়েলারে দেখা দেওয়া যান্ত্রিক ত্রুটি নিখুঁতভাবে সারাতে বিমানের অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা এই মুহূর্তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
ভিভিআইপি ফ্লাইটের কঠোর প্রটোকল অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিগরি দলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই সূক্ষ্ম মেরামতের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। বিমানের অপর একটি নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, জাপানে অবস্থানরত এই কারিগরি দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন বিমানের প্রথিতযশা প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং প্রকৌশলী মান্নান।
তারা দুজনই উড্ডয়ন সম্পর্কিত জটিল কারিগরি ত্রুটি সমাধানে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং ত্রুটি সম্পূর্ণভাবে সারিয়ে তোলার পর উড়োজাহাজটির উড্ডয়নযোগ্যতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হয়েই পরবর্তী উড্ডয়নের সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।
সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সফরসঙ্গীরা জাপানের বিমানবন্দরের সুরক্ষিত ভিভিআইপি লাউঞ্জে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অপেক্ষমাণ রয়েছেন বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বিদ্যমান ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার মহান উদ্দেশ্যে গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানের রাজধানী টোকিওতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তাঁর এই সফরটি ছিল দুই দেশের বিগত দশকের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। সফর চলাকালীন তিনি জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ, নিবিড় ও কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।
ওই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে উভয় দেশের সরকারপ্রধান নিজ নিজ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হস্তান্তর, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন এবং সর্বোপরি ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি অবাধ, উন্মুক্ত ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে তারা বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে কর অবকাশসহ আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং এর বিপরীতে জাপান সরকারও বাংলাদেশের নির্মাণাধীন মেগা প্রকল্পগুলোতে তাদের অব্যাহত আর্থিক, কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা বজায় রাখার বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রথম সারির বিভিন্ন বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও ধারাবাহিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন।
এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সম্মেলনে বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, তরুণ ও দক্ষ জনশক্তির প্রাচুর্য এবং উদীয়মান অর্থনীতির অপার সম্ভাবনার বিষয়টি জাপানি উদ্যোক্তাদের সামনে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়।
মূলত দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্র অদূর ভবিষ্যতে আরও কীভাবে সম্প্রসারিত করা যায় এবং বাংলাদেশের উদীয়মান শিল্প খাত, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অটোমোবাইল শিল্পে জাপানি বিনিয়োগকারীদের কীভাবে আরও বেশি আকৃষ্ট করা সম্ভব-সেই বিষয়গুলোই ছিল এসব হাই-প্রোফাইল আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। এর বাইরে, প্রধানমন্ত্রী তার অত্যন্ত ব্যস্ত সরকারি কর্মসূচির ফাঁকেও জাপানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক সদস্যদের সঙ্গে একটি বিশেষ ও আবেগঘন মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
সেখানে তিনি প্রবাসীদের দৈনন্দিন বিভিন্ন সমস্যা ও প্রবাসজীবনের চ্যালেঞ্জগুলোর কথা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠানোর মাধ্যমে তাদের যে অপরিসীম ও নিঃস্বার্থ অবদান রয়েছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
সার্বিক মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চার দিনের জাপান সফরটি অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অত্যন্ত সফল মিশন হিসেবেই আন্তর্জাতিক মহলে বিবেচিত হচ্ছে।
সফর শেষে দেশে ফেরার পথে উড্ডয়নের আগমুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব সাময়িক উদ্বেগের জন্ম দিলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এটিকে কেবলই একটি সাধারণ কারিগরি বাধা হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক উড্ডয়ন বিধিমালার সর্বোচ্চ মানদণ্ড অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করে উড্ডয়ন বাতিল করার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট পাইলটের সময়োচিত সিদ্ধান্তের প্রশংসাও করছেন। আধুনিক উড়োজাহাজগুলোতে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর ব্যবস্থায় এ ধরনের সংকেত বা স্পয়লার ত্রুটি ধরা পড়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থারই একটি ইতিবাচক দিক।
তবে ফ্লাইটের যাত্রী যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী, তখন নিরাপত্তায় একবিন্দু ছাড় দেওয়ারও কোনো সুযোগ থাকে না। এই মুহূর্তে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে নারিতা বিমানবন্দরে কর্মরত প্রকৌশলীদের মেরামত কাজের চূড়ান্ত অগ্রগতির দিকে।
কারিগরি দল উড়োজাহাজটিকে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত ও উড্ডয়নযোগ্য ঘোষণা করে ছাড়পত্র প্রদান করলেই, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে ভিভিআইপি ফ্লাইট বিজি-৩৭৭ সম্পূর্ণ নিরাপদে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ডানা মেলবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।