নিহত এই যুবকের নাম তাহসিফ সৌরি, যিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন। জানা যায়, গত মঙ্গলবার থেকে তিনি সম্পূর্ণ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিলেন।
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের টঙ্গী এলাকার রাজাবাড়ি ঘাট সংলগ্ন জলভাগ থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় নৌ পুলিশের একটি চৌকস দল। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃতদেহ উদ্ধারের বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক মৃত্যুটি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সুগভীর অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভেতরে নানা ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট থানা ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে উত্তরখান থানার দায়িত্বরত ডিউটি অফিসার শাহীনুর জামান গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বুধবার বিকেলে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির নিবেদিতপ্রাণ সদস্যরা অত্যন্ত তৎপরতার সাথে তুরাগ নদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে তাহসিফ সৌরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করার কাজ সম্পন্ন করেন।
এই পুরো উদ্ধার অভিযানের সূত্রপাত ঘটে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ আসা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোন কলের মাধ্যমে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ বা প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ নদীতে একটি ভাসমান দেহ দেখতে পেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেন।
সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের স্পর্শকাতর বিষয়টির আরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর থেকে তাৎক্ষণিক খবর পাওয়ার পরপরই বুধবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে তাদের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
তারা তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন এলাকার জলভাগ থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মৃতদেহটি উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মৃতদেহটি কার, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ আইন ও বিধি মোতাবেক ঘটনাস্থলেই মৃতদেহের একটি বিস্তারিত সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।
যেকোনো অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুর ক্ষেত্রে সুরতহাল প্রতিবেদন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। সুরতহাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুস্পষ্ট প্রমাণের জন্য মৃতদেহটিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আরও নিশ্চিত করেছেন যে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই কেবল নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে যে এটি কোনো হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা, নাকি নেহাতই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, নিহত তাহসিফ সৌরি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে রাজধানী ঢাকার উত্তরা এলাকার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। তার বাবার নাম কে এম এনায়েত হেলাল, যিনি সন্তানের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিণতিতে গভীরভাবে শোকাহত।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার কোনো এক সময়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি এবং এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সকল স্থানে তার সন্ধান করেও কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না।
নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় তার এমন নিথর দেহ উদ্ধারের খবরটি পরিবারের সদস্যদের জন্য এক অবর্ণনীয় মানসিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। একটি সাজানো গোছানো জীবন থেকে একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক পরিণতি স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যেও ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ভীতির সঞ্চার করেছে।
নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের সময়কার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা গেছে, যা তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে যখন প্রথম ওই ব্যক্তির মৃতদেহ পানি থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন তার বয়স আনুমানিক ২৮ বছর বলে ধারণা করেছিল পুলিশ।
মৃত ব্যক্তির পরনে ছিল একটি সাধারণ সাদা পায়জামা এবং একটি কালো রঙের জামা। এছাড়া তার হাতে একটি হাতঘড়ি পরিহিত অবস্থায় ছিল এবং মুখে ছিল পরিপাটি হালকা দাড়ি। পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে নিহতের পকেটে পাওয়া একটি আইফোন ব্র্যান্ডের মুঠোফোন।
মূলত আধুনিক প্রযুক্তির এই স্মার্টফোনটির মাধ্যমেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পুলিশের সাইবার ও তথ্যপ্রযুক্তি দল ওই অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই পুলিশ জানতে পারে যে, এই নিথর দেহটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির এবং তার স্থায়ী ঠিকানা ঢাকার উত্তরা এলাকার ১৮ নম্বর সেক্টরে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা সমগ্র বিষয়টিকে আরও বেশি রহস্যাবৃত করে তুলেছে। প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বা এর কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে তাহসিফ সৌরি সহ আরও চারজন কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
কী কারণে বা কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে তাকে এবং তার সহকর্মীদের সামরিক বাহিনীর মতো একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তবে এই চাকরিচ্যুতির ঘটনার মাত্র দুই মাস পর তার এমন রহস্যজনক অন্তর্ধান এবং পরবর্তীতে নদী থেকে ভাসমান মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি নানাবিধ জল্পনাকল্পনার জন্ম দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তার এমন পরিণতি অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে, যার উত্তর খোঁজার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হয়তো একটি দীর্ঘ ও জটিল তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
বর্তমানে এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যু রহস্যের জট খোলার জন্য পুলিশের একাধিক শাখা এবং গোয়েন্দা সংস্থা নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করেছে। তারা নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে শুরু করে মৃতদেহ উদ্ধারের সময় পর্যন্ত তাহসিফের গতিবিধি, মোবাইল ফোনের কললিস্ট বা সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড), এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করছেন।
পাশাপাশি, তার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের মানসিক চাপ, শত্রুতা, বা আর্থিক কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সে বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। সর্বোপরি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুতকৃত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করছে এই তদন্তের ভবিষ্যৎ গতিপথ।
একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই এই সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার তাদের কাঙ্ক্ষিত আইনি বিচার বা প্রকৃত সত্য জানতে পারবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলেই গভীরভাবে প্রত্যাশা করছেন। আন্তর্জাতিক মানের একটি পেশাদার তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল এই ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনার পেছনের অন্ধকার দূর করা সম্ভব।