বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা। এর আগে, রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাপানের রাজধানী টোকিওর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাপানে পৌঁছানোর দিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কার্যালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন।
উভয় দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য এই শীর্ষ বৈঠকের পর একটি যৌথ সংবাদ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হবে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এক রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি।
এই চার দিনের নিবিড় সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপানের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রধান এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন।
পাশাপাশি তিনি জাপানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা সরাসরি পরিদর্শন করবেন এবং টোকিওতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম’-এর অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।
এই সফরের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারপ্রধানের এই সময়োপযোগী সফর দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।
এটি বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ তৈরি করবে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটাবে এবং দেশের চলমান বৃহৎ কাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ আরও ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে।
বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাপানের বিশাল ও সম্ভাবনাময় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদার করার বিষয়গুলো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরেও একাধিক সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য। উভয় দেশের নীতিনির্ধারকরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন নিয়ে বিশদ আলোচনা করবেন।
এর পাশাপাশি, জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। তাঁর এই ব্যস্ত সফরসূচির অংশ হিসেবে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পররাষ্ট্র সচিব তাঁর ব্রিফিংয়ে আরও উল্লেখ করেছেন যে, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী একান্ত বৈঠকে মিলিত হবেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন যে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎমুখী মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানি সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শুধু দ্বিপক্ষীয় অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনেও এই সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। উভয় পক্ষের মধ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে চলমান সংকটের একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় দুই দেশের যৌথ ভূমিকা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সরকারের এক বিশাল ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এই প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এবং টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এছাড়া উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এই সফরে অংশগ্রহণ করছেন।
এমন একটি সুসজ্জিত প্রতিনিধিদল প্রমাণ করে যে, সরকার এই সফরের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের প্রতিটি দিককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও গভীর।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বর্তমানে জাপানি অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে নির্মিত ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিশাল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
এই প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাকে আরও গতিশীল করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের সফর বিনিময়ের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটিতে রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছিলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের ইতিহাসে একটি নতুন ও উজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করবে বলে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন টোকিওর দিকে, কারণ এই সফরের ফলাফল শুধু দুটি দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
একুশ শতকের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও জাপানের এই ক্রমবর্ধমান নৈকট্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানোর যে রূপকল্প বাংলাদেশ সরকার নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে জাপানের মতো অকৃত্রিম বন্ধুর প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আর্থিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
একইসঙ্গে, এশিয়া অঞ্চলে জাপানের নিজস্ব কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে, চার দিনের এই নিবিড় ও বহুমাত্রিক রাষ্ট্রীয় সফর শেষে উভয় দেশ পারস্পরিক সম্মান, অভিন্ন স্বার্থ এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ভিত্তিতে তাদের সম্পর্ককে এমন এক শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাবে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে দুই দেশের নাগরিকদের জন্যই সমানভাবে সুফল বয়ে আনবে।