সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এই আহ্বান জানান।
একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের প্রতিটি মানুষকে সবার আগে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় ধারণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মূলত এমন একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীর ভেদাভেদ ভুলে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ধর্মীয় চর্চা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের।
এই রাষ্ট্রের ওপর যেমন সকল নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত ও উন্নত করার ক্ষেত্রেও সবার সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য বিদ্যমান। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও সংবেদনশীল কণ্ঠে তিনি বলেন, ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র সবার।
এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। একই সঙ্গে নাগরিকদের প্রতিও তিনি আহ্বান জানান যেন তারা একে অপরের সুরক্ষায় ও কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের গভীর আস্থার সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের বিষয়ে আরও বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি আমাদের সকলের।
এই দেশটিতে একজন সাধারণ নাগরিকের যতটুকু অধিকার রয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তির অধিকারও ঠিক ততটুকুই। আবার, এই দেশের প্রতি সাধারণ নাগরিকের যেমন কর্তব্য রয়েছে, তেমনি অন্যদেরও সমান কর্তব্য পালন করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিটি নাগরিককে তার ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করা। ঠিক একইভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, সুখে-দুঃখে একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের সকলের সম্মিলিত নাগরিক দায়িত্ব।
মানুষ হিসেবে একে অপরকে মূল্যায়ন করার ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অতীত সংগ্রামের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তাঁর বক্তব্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যখন এই ভূখণ্ডের মুক্তিকামী মানুষ স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন রণক্ষেত্রে কেউ কারও ধর্মীয় পরিচয় জানতে চায়নি। কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ বা কে খ্রিষ্টান-এমন বিভাজন সেদিন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করতে পারেনি।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই স্বাধীনতার মূল মন্ত্রই ছিল সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে আবারও নতুন করে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
পরবর্তী সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যখনই এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই রাজপথে নেমে এসেছে সাধারণ মানুষ।
স্বৈরাচারী শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময়ও আন্দোলনকারীরা কখনোই তাদের পাশের সহযোদ্ধার ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাননি। ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সব ধর্মের মানুষ সবসময় একসঙ্গে লড়াই করেছে।
রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথে ধর্মীয় পরিচয় কখনোই কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সফল ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ কণ্ঠে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, চোখের পাতা বন্ধ করলেই সেই উত্তাল দিনগুলোর দৃশ্যপট এখনো আমাদের সবার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় যখন হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করেনি তাদের ধর্মের কথা।
অধিকার আদায়ের সেই তীব্র আন্দোলনের সময় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। জুলাই ও আগস্ট মাসের সেই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে সব ধর্মের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ ছিল।
এই দিন সকালেই তিনি রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে 'জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ'-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে এসেছেন বলে জানান। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যারা দেশের জন্য, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সেদিন নিজেদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই বীর শহীদদের তালিকায় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান-সব ধর্মের মানুষই রয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি মানুষ সেদিন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য, একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়ে গেছে যে, বিপদে ও দুর্যোগে আমরা কেবলই মানুষ, আমাদের আর কোনো ভিন্ন পরিচয় নেই।
দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির রূপরেখা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, যদি এই দেশটার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, যদি দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়, তবে এর সুফল দল-মত ও ধর্ম নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ ভোগ করবে।
দেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হলে যেমন একজন মুসলমান উপকৃত হবেন, ঠিক তেমনিভাবে উপকৃত হবেন একজন হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান নাগরিক। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়নের সুফল কখনোই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় না।
তাই ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের স্বার্থেই আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিভেদ ও বৈষম্যের রাজনীতিকে পেছনে ফেলে মানবিক পরিচয়কে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যখন দেশের ওপর কোনো বিপর্যয় নেমে আসে, তখন সেই বিপর্যয় কারও ধর্ম দেখে আঘাত হানে না।
আবার যখন দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়, তখন সেই সমৃদ্ধির আলো সবার ঘরেই সমানভাবে পৌঁছায়। তাই মানুষের ভালো থাকা এবং খারাপ থাকার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। মানবতাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আসুন, আমরা নিজেদের সবার আগে 'মানুষ' হিসেবে বিবেচনা করি এবং একজন আরেকজনকে এই দেশের গর্বিত নাগরিক ও 'বাংলাদেশি' হিসেবে আপন করে নিই। পরিশেষে, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি এই ধর্মীয় উৎসবকে নিছক কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের এক মহামিলনমেলা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একটি আনন্দমুখর ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
তারাও তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং একটি আধুনিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শন ও তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে সম্প্রীতি ও সহনশীলতার এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, যা আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে প্রতীয়মান হয়।