তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, সকল ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধাবোধের যে অনন্য নজির বাংলাদেশ যুগে যুগে স্থাপন করেছে, বর্তমান বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে তার দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিরল।
রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দিরে আয়োজিত শারদীয় দুর্গোৎসবের এক আড়ম্বরপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই ব্যক্তিসত্তার মন্দির পরিদর্শন ও সম্প্রীতির বার্তা প্রদান সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আস্থার সৃষ্টি করেছে। শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি বাহ্যিক বা সাধারণ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর গভীরে নিহিত রয়েছে মানবকল্যাণের এক শাশ্বত ও চিরন্তন দর্শন।
রাষ্ট্রপতি তার মূল্যবান বক্তব্যে এই দর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, অসততা এবং সকল প্রকার নিপীড়নের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে রুখে দাঁড়ানো এবং চূড়ান্ত ও আপসহীন সংগ্রামে অশুভ শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হলো দুর্গাপূজার মূল ও অন্তর্নিহিত শিক্ষা।
বর্তমানের জটিল ও সংঘাতময় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হানাহানি, সংঘাত, যুদ্ধবিগ্রহ এবং জাতিতে জাতিতে হিংসা ও বিদ্বেষের দাবানল জ্বলছে, ঠিক সেই চরম অস্থিরতা ও বৈরী সময়ের মাঝেও বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সম্পূর্ণ উৎসবমুখর, নির্বিঘ্ন ও অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করতে পারছেন।
রাষ্ট্রপতির মতে, এই চমৎকার ও স্বস্তিদায়ক চিত্রটি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সহমর্মিতা, গভীর সম্প্রীতি এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত।
দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিটি নাগরিককে শারদীয় শুভেচ্ছায় সিক্ত করে তিনি বলেন, এই সর্বজনীন উৎসব সমগ্র দেশবাসীকে ন্যায়বিচার, বিশ্বশান্তি, অটুট সামাজিক সম্প্রীতি এবং সর্বজনীন মানবকল্যাণের আলোকিত পথে ধাবিত হওয়ার দীক্ষা প্রদান করে।
দেশ ও জাতির কল্যাণে অশুভ শক্তির চূড়ান্ত বিনাশ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপক অর্থে বলেন, যুগে যুগে এই পবিত্র ভূখণ্ডে বারবার অসুরের বা অশুভ শক্তির আর্বিভাব ঘটেছে।
এই অপশক্তি সবসময় এদেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করতে চেয়েছে এবং সমাজের সুদৃঢ় শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার বহুমুখী ও সুকৌশলী অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিকামী, অসাম্প্রদায়িক ও সাহসী মানুষ সর্বদা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে সেই সব অশুভ শক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করেছে।
এরপর তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ও বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাজধানীর ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দিরের সুদীর্ঘ অতীত ও করুণ পটভূমির কথা তুলে ধরেন। তিনি সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের নৃশংসতার অংশ হিসেবে এই পবিত্র উপাসনালয়টিকে ধ্বংস করার এক সুপরিকল্পিত ও বর্বরোচিত চেষ্টা চালিয়েছিল।
তবে স্বাধীন বাংলাদেশে এই মন্দিরটির ওপর পরবর্তী আঘাতের নির্মম ইতিহাস তুলে ধরে তিনি গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে এই মন্দিরটিকে পুনরায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগের সুরে ও বাস্তবতার নিরিখে বলেন, দেশের রাজনীতিতে যারা সবসময় ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আওড়ান, মূলত তাদেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনে ও মদদে সেই সময়ে এই জঘন্য ও নিন্দনীয় অপকর্মটি সংঘটিত হয়েছিল।
রমনা কালী মন্দিরের হারানো গৌরব ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তিনি জানান, দীর্ঘকাল অবহেলিত ও ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকার পর অবশেষে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় এবং বিশিষ্ট রাজনীতিক বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ঐকান্তিক উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দির পুনঃস্থাপিত করার এক মহতী কার্যক্রম শুরু হয়।
মূলত সেই সময়কাল থেকেই মন্দিরটিকে তার প্রাচীন ও গৌরবময় ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত ও নিরলস প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়, যার সুফল আজ এই প্রজন্মের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বুক ভরে ভোগ করছেন।
এই স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় এবং ধর্মীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার সরকার যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল, রাষ্ট্রপতির রোমন্থন করা এই বক্তব্যে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে যেসব ভুল তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সে বিষয়েও রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে অত্যন্ত কঠোর, নির্মোহ ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন।
দেশের হাজার বছরের লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একতাবদ্ধ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি বিশেষ ও স্বার্থান্বেষী মহল সুকৌশলে বাংলাদেশের অটুট সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে দেশে-বিদেশে সবসময় অপব্যাখ্যা দিয়ে আসছে এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
তিনি সমগ্র দেশবাসীকে এই ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, বর্তমানে হিন্দু সম্প্রদায় বা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যেসব বিদ্যমান সমস্যা বা সংকট রয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে সমাধানে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে এবং নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।
সরকার যে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান আইনি ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিতে শতভাগ বদ্ধপরিকর, তা তার এই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবশেষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশব্যাপী আয়োজিত শারদীয় দুর্গোৎসবের সার্বিক সাফল্য, নির্বিঘ্নতা ও মঙ্গল কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে আগত পূজারি, ভক্ত ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের তাদের চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানান। রাষ্ট্রপতির এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্প্রীতিমূলক পরিদর্শনের সময় অন্যান্য সম্মানীত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত) বিজন কান্তি সরকার।
এছাড়াও সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অভ্যর্থনায় উপস্থিত ছিলেন রমনা কালী মন্দিরের সম্মানিত সভাপতি অর্পনা রায় দাস এবং সাধারণ সম্পাদক মিল্টন বৈদ্যসহ অন্যান্য বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ। অত্যন্ত উৎসবমুখর, ভাবগম্ভীর ও আনন্দঘন এই অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসার অনন্য নিদর্শনস্বরূপ রমনা মন্দিরের কার্যনির্বাহী সদস্য সুভাষ চন্দ্র দাস রাষ্ট্রপতিকে ঐতিহ্যবাহী উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে বরণ করে নেন।
রাষ্ট্রপতির এই উপস্থিতির মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্রের সকল ধর্মের ও বর্ণের নাগরিকের প্রতি সমান সম্মান, মূল্যায়ন ও সুরক্ষার এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা সমগ্র দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।