এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য প্রদান চলাকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল সম্মেলন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেছে।
মূলত ফিলিস্তিনের মজলুম জনতার প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসনের নীরব প্রতিবাদ হিসেবেই বাংলাদেশ এই দৃঢ় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ওয়াকআউট কেবল একটি প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের অবিচল অবস্থানেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট যখন তার নির্ধারিত বক্তব্য প্রদানের জন্য মঞ্চে আরোহণ করেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে এই প্রতিবাদে বাংলাদেশ একা ছিল না। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাশাপাশি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আরও বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য বয়কট করে তাৎক্ষণিকভাবে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আওতায় ওয়াকআউট একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং শক্তিশালী প্রতিবাদের মাধ্যম। যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের নীতি, আগ্রাসন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম বিরোধিতা করে, তখন সরাসরি বাকবিতণ্ডায় না জড়িয়ে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করার মাধ্যমে তারা নিজেদের কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরে।
বাকুতে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনেও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি বৃহৎ অংশের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রামের প্রতি শর্তহীন এবং অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করে আসছে।
আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। সুতরাং, বাকুতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের ওয়াকআউট করার এই ঘটনাটি কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতিরই একটি ধারাবাহিক অংশ।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও প্রমাণ করল যে, ভূরাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কোনো সমীকরণের মুখেই তারা নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের ঐতিহাসিক সমর্থন থেকে পিছপা হবে না। জাতিসংঘ, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোতেও বাংলাদেশ বরাবরই ফিলিস্তিনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা পালন করে এসেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির আঙিনায় বাংলাদেশ সর্বদা এই বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরেছে যে, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত মধ্যপ্রাচ্যে কোনোভাবেই স্থায়ী শান্তি আনয়ন করা সম্ভব নয়।
ঠিক এই একই আদর্শিক অবস্থান থেকে বাকুতে আয়োজিত সিআইসিএ শীর্ষ সম্মেলনেও বাংলাদেশ তার নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে। সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা যখন পারস্পরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের মঞ্চে উপস্থিতি পুরো আয়োজনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের সঙ্গেই এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করে।
এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা বিষয়ক সম্মেলন বা সিআইসিএ মূলত এশিয়া মহাদেশে শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত একটি বহুজাতিক ফোরাম। এমন একটি বিশাল এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলের মতো একটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি এবং বক্তব্য প্রদান স্বাভাবিকভাবেই অনেক সদস্য রাষ্ট্রের কাছেই অস্বস্তিকর।
কারণ, সিআইসিএ-এর মূল লক্ষ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, অথচ ইসরায়েল ক্রমাগতভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক আগ্রাসন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা এশিয়া তথা পুরো বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।
তাই এমন একটি শান্তি প্রতিষ্ঠাকামী সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য প্রদানকে অনেক দেশই প্রহসন হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং ওয়াকআউটের মাধ্যমে সেই অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাকুর এই শীর্ষ সম্মেলনে একাধিক দেশের একযোগে ওয়াকআউট করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান একাকীত্বকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা, সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সাধারণভাবেই একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের এই সময়োচিত এবং সাহসী সিদ্ধান্ত শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্ব এবং শান্তিকামী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
ওয়াকআউট হচ্ছে কূটনীতির এমন একটি সূক্ষ্ম অথচ তীক্ষ্ণ অস্ত্র, যা কোনো প্রকার শব্দ উচ্চারণ না করেই প্রতিপক্ষের প্রতি সর্বোচ্চ অনাস্থা এবং তিরস্কার জ্ঞাপন করতে সক্ষম। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল যখন ধীর পায়ে অথচ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করছিল, তখন সেটি নিছক কয়েকজন ব্যক্তির প্রস্থান ছিল না; বরং তা ছিল সামগ্রিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
এই ওয়াকআউট ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নৈতিক সমর্থন হিসেবে কাজ করবে। ফিলিস্তিনিরা যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার এক অসম এবং দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে অবতীর্ণ, তখন আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে এ ধরনের সংহতি প্রকাশ তাদের সংগ্রামকে আরও বেশি বৈধতা এবং শক্তি প্রদান করে।
বাকুর সম্মেলনে বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য যেসব দেশ এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছে, তাদের এই সম্মিলিত পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এই বলিষ্ঠ অবস্থান প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ কেবল তার নিজস্ব স্বার্থ নিয়েই কথা বলে না, বরং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নেও তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে সর্বদা প্রস্তুত।
পরিশেষে বলা যায়, আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত সপ্তম সিআইসিএ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের ওয়াকআউট আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকবে।
এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিরোধিতা নয়, বরং এটি অন্যায়, অবিচার এবং দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী গর্জন। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ অন্যান্য শান্তিকামী দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে, যেন তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আরও বেশি সোচ্চার হয়।
যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ফিরে না পাচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ এভাবেই তার নীতিগত ও মানবিক অবস্থানে অবিচল থাকবে বলে কূটনৈতিক মহল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।