দেশের পরিবেশ ও বনজ সম্পদ রক্ষায় কেবল সরকারি কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে সর্বস্তরের মানুষের জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দাপ্তরিক দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অতিরিক্ত উদ্যোগ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার, পনেরোই অক্টোবর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন বিষয়ক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি এই দিকনির্দেশনামূলক আহ্বান জানান।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির সম্মিলিত টিকে থাকার লড়াই। উক্ত পর্যালোচনা সভায় দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত হলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন ‘মাতৃবৃক্ষ’ বা মাদার ট্রিগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সর্বোচ্চ আইনি ও কাঠামোগত সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
সরকার মনে করে, এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবল প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরই অংশ নয়, বরং স্থানীয় বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। একই সঙ্গে সভায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা প্রদান করেন যে, কেবল লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য চারা গাছ লাগালেই হবে না, বরং রোপণ করা সেই চারাগুলো যথাযথভাবে বেঁচে আছে কি না এবং সেগুলো নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিচর্যা পাচ্ছে কি না, তা নিজস্ব পরিদর্শক দল পাঠিয়ে সরেজমিনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করতে হবে।
পাশাপাশি, দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক হারে বনায়ন বৃদ্ধির জন্য নতুন ও উদ্ভাবনী উপায় খুঁজে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। নগরজীবনে মানুষের প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসার বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরগুলো আজ কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, যেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো উন্মুক্ত সবুজ পরিসরের চরম অভাব রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে তিনি প্রতিটি ভবনে ছাদবাগান তৈরি, স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় বাগান সৃজন এবং সরকারি-বেসরকারি সকল স্থাপনায় সবুজের সমারোহ বাড়াতে দেশের সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করার ওপর বিশেষ জোর দেন।
সরকারের এই মহতী উদ্যোগগুলোকে সফল করতে হলে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ যে অপরিহার্য, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, পরিবেশ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও তাদের নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন করে তুলতে হবে।
কারণ, সমাজের প্রতিটি মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ ততটাই সহজ ও টেকসই হবে। পরিবেশ ও বন রক্ষায় গৃহীত সকল সরকারি সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য একটি পৃথক ও শক্তিশালী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের রূপরেখা প্রণয়নের ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিনিয়ত যে নেতিবাচক আলোচনা হচ্ছে, সেটিকে একটি জাতীয় সংকটের পাশাপাশি দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয় বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচকে ঢাকা শহর প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এই ভয়াবহ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আনতে হলে কোনো একক সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বরং প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শিল্পকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের অনিয়ন্ত্রিত ধুলোবালি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন অনুশীলনের আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রণালয়ের উপস্থিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী এক আবেগঘন ও প্রেরণাদায়ী বক্তব্য প্রদান করেন। প্রশাসনিক কাজের গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আপনাদের ওপর যে নির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু করার মেধা, যোগ্যতা ও সক্ষমতা আপনাদের রয়েছে।
দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য কাজ করার এবং জাতীয় ইতিহাস পরিবর্তনের এমন সুবর্ণ সুযোগ সবার জীবনে আসে না। যারা আজ রাষ্ট্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণী অবস্থানে রয়েছেন, তাদের উচিত এই অনন্য সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা।
কেবল সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নির্ধারিত দাপ্তরিক কাজ পালন করেই আত্মতুষ্টিতে ভুগে থেমে গেলে চলবে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে এবং একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার নিরলস চেষ্টা থাকতে হবে।
দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে এই দেশের মাটি ও মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু করার একটি অপূর্ব সুযোগ প্রদান করেছেন।
কেউ চাইলে কেবল প্রথাগত দাপ্তরিক সময়টুকু পার করেই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারেন, এর জন্য হয়তো কেউ তাকে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনবে না বা তিরস্কার করবে না। কিন্তু আমাদের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে যদি দেশের সার্বিক পরিবেশ চরমভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তবে আমাদেরই অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির শিকার হবে।
কারণ, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তো এই দেশের মাটিতেই বেঁচে থাকতে হবে। দেশের পরিবেশকে ভালো ও বাসযোগ্য রাখতে হলে তাই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের তাদের প্রথাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও বাড়তি কিছু কাজ করতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই, তবে নিজেদের সম্পূর্ণ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে সামনের সারিতে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, দেশজুড়ে মোট পঁচিশ কোটি নতুন গাছ লাগানোর একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে এর সুদূরপ্রসারী সুফল দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ ভোগ করতে পারবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যদি এই বৃক্ষরোপণ মহোৎসবে একাত্ম হয়ে এগিয়ে আসে, তবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। বৈঠকে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়গুলো যদি কোনো কারণে তাদের নিজ নিজ বিভাগের জন্য নির্ধারিত বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয় বা কম গাছ লাগায়, তবে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘাটতি পূরণের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে রোপণ করা প্রতিটি গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও দীর্ঘমেয়াদি নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও এই পর্যালোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ এই নীতিনির্ধারণী পর্যালোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, একই মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানসহ আরও অনেক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞবৃন্দ। তাদের সকলের উপস্থিতিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।