মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় তিনি এই সময়োপযোগী নির্দেশনা প্রদান করেন।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার রোধ করাকে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন।
সভায় সভাপতিত্বকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী কয়েক মাসকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তার রোধ করতে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে একটি সুদৃঢ় ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে দেশের যেসব এলাকায় এরই মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেসব অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও বহুগুণে জোরদার করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই আগাম সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারি উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমই যথেষ্ট নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
সাধারণ মানুষের কাছে ডেঙ্গু সচেতনতার বার্তা অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি দুটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও ধর্মীয় মাধ্যম ব্যবহারের ওপর জোর দেন। প্রথমত, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে নিজ নিজ বসতবাড়ি, ছাদ ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতন করে তোলা। দ্বিতীয়ত, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির জায়গাটি বিবেচনা করে শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় মসজিদের সম্মানিত ইমামদের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ও পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরে ডেঙ্গু মোকাবিলার বার্তা অত্যন্ত কার্যকরভাবে পৌঁছাবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। সভায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার লক্ষ্যে সরকারি অবকাঠামো ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশদ আলোচনা হয়।
এ প্রসঙ্গে সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার, বাসভবন এবং রাজধানীসহ সারা দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সাধারণত বাসাবাড়ির ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পরিষ্কার পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা এবং ফুলের টবে এডিস মশা বংশবিস্তার করে থাকে। তাই সরকারি স্থাপনাগুলোতে যেন কোনোভাবেই এডিস মশা বংশবিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণকারী বিভাগগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজেদের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে সাধারণ নাগরিকরাও এতে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত হবেন এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমকে একটি সফল ও দৃশ্যমান রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের নিবিড় সমন্বয় জোরদার করার ওপর সভায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে একযোগে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
স্বাস্থ্য খাতকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত শয্যা, তরল স্যালাইন ও ওষুধের মজুতসহ সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি করপোরেশনগুলোকে মশক নিধন কার্যক্রমে আরও বেশি গতিশীলতা আনার তাগিদ দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান এবং মাঠপর্যায়ে কাজের দ্বৈততা পরিহার করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে সভায় উপস্থিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী সভায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
এছাড়া সভায় উপস্থিত থেকে নিজ নিজ বিভাগের সার্বিক প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
সিটি করপোরেশনের শীর্ষ প্রশাসকদের উপস্থিতি এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে, রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার কতটা বদ্ধপরিকর। উপস্থিত মন্ত্রী ও পদস্থ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিটি নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এডিস মশার বিস্তার এখন আর কেবল বর্ষাকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বছরের প্রায় সব সময়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ লক্ষ করা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তিত ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন আঙ্গিকে ও উদ্ভাবনী উপায়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, মশাবাহিত যেকোনো রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশ সরকারও ঠিক একই পথে হেঁটে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। মাইকিং ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে সামাজিক সচেতনতার কাজে ব্যবহার করার এই সুচিন্তিত কৌশলটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হতে পারে, কারণ এটি সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।
পরিশেষে, ডেঙ্গু নামক এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে দেশের আপামর জনসাধারণকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সময়োপযোগী নির্দেশনাগুলো একটি কার্যকর মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কেবল সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি পরিচ্ছন্ন, মশকিমুক্ত ও সুস্থ সমাজ গঠন করা সম্ভব।
আগামী দিনগুলোতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো যদি সমন্বিতভাবে এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে এবং জনগণ যদি সচেতন হয়ে নিজেদের চারপাশ পরিষ্কার রাখে, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই ডেঙ্গু পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই কঠোর ও সুস্পষ্ট বার্তা প্রমাণ করে যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার কোনো ধরনের অবহেলা বা প্রশাসনিক শিথিলতা বরদাশত করবে না।