এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একক বোয়িং-নির্ভরতা কাটিয়ে বিমানের বহরে প্রথমবারের মতো এয়ারবাসের তৈরি উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বা বিমান পরিবহন খাতে এটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর ফলে বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীদের সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক এভিয়েশন বাজারে বিমানের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বুধবার, ৭ অক্টোবর, রাত ৯টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর স্বনামধন্য র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ ও পেশাদার পরিবেশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং এয়ারবাসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার।
নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন এয়ারবাসের প্রতিনিধি জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ।
নতুন স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সর্বমোট ১০টি উড়োজাহাজ ক্রয় করবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশস্ত কাঠামোর বা ওয়াইড-বডির চারটি ‘এ৩৫০-৯০০’ মডেলের উড়োজাহাজ এবং সরু কাঠামোর বা ন্যারো-বডির ছয়টি ‘এ৩২১নিও’ মডেলের উড়োজাহাজ।
বিমানের ভবিষ্যৎ রুট সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে এই নির্দিষ্ট উড়োজাহাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন চারটি ‘এ৩৫০-৯০০’ উড়োজাহাজ দিয়ে মূলত দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটগুলো, যেমন ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার দূরবর্তী গন্তব্যগুলোতে বিরতিহীন ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের।
প্রশস্ত কাঠামোর এই উড়োজাহাজগুলো একদিকে যেমন দীর্ঘ যাত্রায় যাত্রীদের সর্বোচ্চ আরাম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে উন্নত অ্যারোডাইনামিকস প্রযুক্তির কারণে জ্বালানি সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছয়টি ‘এ৩২১নিও’ মডেলের উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হবে মূলত আঞ্চলিক গন্তব্য এবং মাঝারি দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব রুটে বড় বা প্রশস্ত কাঠামোর উড়োজাহাজের প্রয়োজন নেই এবং যাত্রী ধারণক্ষমতার চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম, সেসব গন্তব্যে আধুনিক ‘এ৩২১নিও’ মডেলটি পরিচালনা করা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক ও বাস্তবসম্মত হবে।
এর ফলে বিমানের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং যাত্রীদের সুবিধার্থে রুটগুলোতে ফ্লাইটের সংখ্যা বা ফ্রিকোয়েন্সি প্রয়োজন অনুযায়ী বৃদ্ধি করা অনেক সহজ হবে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্পের বর্তমান সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উড়োজাহাজ নির্মাণের দীর্ঘ সময়সীমার কথা বিবেচনায় নিয়ে এয়ারবাসের এই অত্যাধুনিক উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে ২০৩৩ সাল থেকে।
পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সালের মধ্যে এই ১০টি উড়োজাহাজ পুরোপুরি বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির গোপনীয়তা নীতি এবং ব্যবসায়িক কৌশলগত কারণে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার এই সুবিশাল চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য বা খরচের হিসাব এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এয়ারবাসের সঙ্গে এই নতুন চুক্তির আগে, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি তার পুরো বহরের জন্য সম্পূর্ণভাবে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে বিমানের জেট উড়োজাহাজের প্রায় পুরোটাই বোয়িংয়ের তৈরি।
এয়ারবাসের এই নতুন ১০টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমান প্রথমবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ দুটি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান-বোয়িং ও এয়ারবাসের সমন্বয়ে একটি দ্বৈত বা মিশ্র বহর পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সফল বৈশ্বিক এয়ারলাইনসেরই একটি প্রমাণিত ব্যবসায়িক কৌশল।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি বছর বোয়িংয়ের কাছ থেকেও বড় পরিসরে উড়োজাহাজ কেনার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে চলতি বছরেই দুই দফায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি নতুন অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি।
গত ৩০ এপ্রিল প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রথম মেগা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই বিশাল চুক্তির আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।
এই ১৪টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার আটটি ‘৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার’, দুটি ‘৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার’ এবং মাঝারি দূরত্বের চারটি ‘৭৩৭-৮’ মডেলের উড়োজাহাজ। পরবর্তীতে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে আরও ১১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে দ্বিতীয় দফার চুক্তি স্বাক্ষর করে বিমান।
এই চুক্তির আওতায় পাঁচটি ‘৭৮৭-১০’ এবং ছয়টি ‘৭৩৭-৮ ম্যাক্স’ মডেলের অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনা হবে। অর্থাৎ, চলতি বছরের এই দুই দফার মেগা চুক্তি মিলিয়ে শুধুমাত্র মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকেই বিমানের কেনা মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের কাছ থেকে কেনা এই নতুন উড়োজাহাজগুলো আগামী ২০৩১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে বিমানের বহরে যুক্ত হতে শুরু করবে।
বৈশ্বিক চাহিদার কারণে সবগুলো উড়োজাহাজ ডেলিভারি পেতে আনুমানিক ১১ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তবে এই চুক্তির একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো, উড়োজাহাজগুলোর জন্য একসঙ্গে পুরো মূল্য পরিশোধের কোনো চাপ বাংলাদেশ সরকারের ওপর পড়বে না।
যখনই একটি করে উড়োজাহাজ বিমানের কাছে সফলভাবে সরবরাহ করা হবে, ঠিক তখনই শুধুমাত্র সেটির নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করা হবে। উড়োজাহাজ প্রাপ্তির এই দীর্ঘ সময়সীমার কথা বিবেচনা করে বিমান কর্তৃপক্ষ অন্তত একটি উড়োজাহাজ নির্ধারিত সময়ের আগে, অর্থাৎ ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করার জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছে বিশেষ ও জরুরি অনুরোধ জানিয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এয়ারবাসের ১০টি এবং বোয়িংয়ের ২৫টি মিলিয়ে সর্বমোট ৩৫টি সম্পূর্ণ নতুন উড়োজাহাজ আগামী দেড় দশকের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
এই ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজের মধ্যে ১৯টি হলো ওয়াইড-বডি বা প্রশস্ত কাঠামোর, যা দিয়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিরবচ্ছিন্নভাবে দূরপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট ১৬টি হলো ন্যারো-বডি বা সরু কাঠামোর উড়োজাহাজ, যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করা হবে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মূল বহরে সর্বমোট ১৯টি উড়োজাহাজ সচল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং এবং ৫টি ড্যাশ-৮ মডেলের উড়োজাহাজ। তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহার এবং বিভিন্ন কারিগরি ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
বাকি ১৭টি উড়োজাহাজও তাদের অর্থনৈতিক জীবনচক্র শেষের দিকে থাকায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বহর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ পড়ার কথা রয়েছে। পুরোনো এই উড়োজাহাজগুলো বহর থেকে বাদ পড়ার পর এবং নতুন কেনা উড়োজাহাজগুলো হাতে পাওয়ার আগে-মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়টিতে বিমানের স্বাভাবিক রুট পরিচালনা ও যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতায় এক বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সংকট ও সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে বিমান কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে আরও ১০টি উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সাময়িকভাবে ইজারা বা লিজ নেওয়ার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে একাধিকবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তবে বিশ্ববাজারে উড়োজাহাজের তীব্র সংকট এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজ লিজ নিতে সক্ষম হয়নি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থাটি।
দীর্ঘমেয়াদে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভবিষ্যৎ রূপরেখা অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল ও উজ্জ্বল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে বহরে থাকা সচল উড়োজাহাজের পাশাপাশি যদি নতুন চুক্তিকৃত ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে যুক্ত হয়, তবে পুরোনো ও অচল উড়োজাহাজগুলো বাদ দেওয়ার পরও ভবিষ্যতে বিমানের নিজস্ব বহরে উড়োজাহাজের মোট সংখ্যা ৫০-এর কোঠা ছাড়িয়ে যাবে।
একটি আধুনিক, নিরাপদ ও সম্প্রসারিত বহর নিয়ে বিশ্বের আকাশপথে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাবাহী বিমান এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্পের দ্রুত বিকাশে এক অবিস্মরণীয় অবদান রাখবে।