বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, চরম দুশ্চিন্তায় জেলেরা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, চরম দুশ্চিন্তায় জেলেরা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও মৎস্য সম্পদের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ইলিশ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই রুপালি সম্পদের ব্যাপক চাহিদা ও সুখ্যাতি রয়েছে। এই অমূল্য সম্পদকে টিকিয়ে রাখা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী শুরু হতে যাচ্ছে মা ইলিশ সংরক্ষণের ২২ দিনের বিশেষ অভিযান।

 

এই সময়কালে প্রমত্তা পদ্মা নদীসহ দেশের সকল নদ-নদীতে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। জাতীয় স্বার্থে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য হলেও, নদীর উপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জেলেদের জীবনে এই বাইশ দিন নিয়ে আসে এক চরম অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বের সংকট।

 

নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নদীতে জাল ফেলা বন্ধ থাকলেও, প্রান্তিক এই মৎস্যজীবীদের সংসারের প্রাত্যহিক খরচ ও জীবনসংগ্রাম এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। ফলে, বিকল্প আয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় এবং সরকারি ত্রাণের অপ্রতুলতায় রাজবাড়ী জেলার পদ্মাপাড়ের হাজার হাজার জেলে পরিবার বর্তমানে এক গভীর ও দুর্বিষহ দুশ্চিন্তার প্রহর গুনছেন।

 

মা ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে মিঠা পানির নদীতে উঠে আসে। এই সময়টাতে তাদের নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দেওয়াটা পরবর্তী বছরে ইলিশের প্রাচুর্য নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে এসেছেন যে, এই ২২ দিনের সফলতার ওপরই নির্ভর করে দেশের সমগ্র ইলিশ উৎপাদন।

 

কিন্তু এই সফলতার পেছনে যে জেলেদের আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে, তাদের জীবনমানের সুরক্ষার বিষয়টি বরাবরই অবহেলিত থেকে যায়। জেলেদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সরকারি মৎস্যজীবী পরিচয়পত্র বা জেলে কার্ড বণ্টন প্রক্রিয়ার চরম অব্যবস্থাপনা ও স্বজনপ্রীতি।

 

প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের দাবি, যারা বছরের পর বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রমত্তা পদ্মার বুকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তাদের একটি বড় অংশেরই কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা কার্ড নেই।

 

অন্যদিকে, যাদের সঙ্গে নদী, নৌকা বা জালের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই, এমন অনেক অসাধু ব্যক্তি বা অমৎস্যজীবী রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির মাধ্যমে এই কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের দেওয়া সামান্যতম সহায়তাটুকুও প্রকৃত জেলেদের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না।

 

বৈষম্যের এই নগ্ন চিত্র প্রান্তিক জেলেদের ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই বৈষম্য ও অপ্রতুলতার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। রাজবাড়ী জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন।

 

এর মধ্যে সরাসরি ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা মাত্র ৬ হাজার ৩০৪ জন। কিন্তু বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক বিষয় হলো, আসন্ন এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি খাদ্য সহায়তা বা ভিজিএফের চাল বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৫ হাজার ৫৯২ জন জেলের জন্য।

 

সহজ অঙ্কের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, অন্তত ৭১২ জন কার্ডধারী ইলিশ শিকারি জেলে এই সরকারি খাদ্য সহায়তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হবেন। আর যাদের কার্ড নেই, সেই হাজার হাজার প্রকৃত জেলের কথা তো এই সরকারি হিসেবের খাতাতেই নেই।

 

স্বীকৃতিহীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী নিষেধাজ্ঞার এই দিনগুলোতে কীভাবে তাদের পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেবেন, তার কোনো সদুত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। নিষেধাজ্ঞা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট, মিজানপুর এবং গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটের পদ্মাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক ভিন্ন রকম নীরবতা ও প্রস্তুতির চিত্র।

 

জেলেরা তাদের নৌকা ও জাল ডাঙায় তুলে এনে মেরামতের কাজে নিবিষ্ট রয়েছেন। কেউ ছিঁড়ে যাওয়া জালের সুতো বুনছেন, কেউবা নৌকার তলানিতে আলকাতরার প্রলেপ দিচ্ছেন। দৃশ্যত তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নদী থেকে দূরে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু তাদের চোখেমুখে খেলা করছে আগামী বাইশ দিনের অনাহারের আতঙ্ক।

 

বরাট এলাকার এমন একজন প্রান্তিক জেলে জমির হালদার। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে দীর্ঘশ্বাসের সাথে তিনি জানান যে, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে তিনি নিয়মিত এই প্রমত্তা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। অথচ অদ্যাবধি তার ভাগ্যে একটি সরকারি জেলে কার্ড জোটেনি।

 

তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত জন। প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর ভিত্তি করেই তার পরিবারের চুলা জ্বলে। নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ ২২ দিন কীভাবে তার সংসার চলবে, সেই চিন্তায় তিনি দিশেহারা। আক্ষেপের সুরে তিনি জানান, মৎস্য শিকার ছাড়া অন্য কোনো পেশায় তার দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই।

 

তাই পেটের তীব্র ক্ষুধা আর পরিবারের সদস্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়েই হয়তো তাকে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে নদীতে জাল ফেলতে হবে। পেটের দায় যে কোনো আইনের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর, জমির হালদারের এই অসহায় আত্মসমর্পণ যেন সেই রূঢ় বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি।

 

অন্যদিকে, মিজানপুর গ্রামের আরেক জেলে ইয়াকুব আলীর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও সংকট তারও পিছু ছাড়েনি। তার একটি সরকারি জেলে কার্ড রয়েছে এবং তিনি সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে এই ২২ দিন নদীতে না নামার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।

 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সহায়তা হিসেবে যে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হবে, তা দিয়ে তার মতো একটি বড় পরিবারের পুরো একটি মাস পার করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। শুধু চাল দিয়ে তো আর জীবন চলে না, পরিবারের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের লেখাপড়া-সবকিছু মিলিয়ে এই সামান্য চাল একপ্রকার উপহাসের মতোই মনে হয় তার কাছে।

 

তিনি মনে করেন, এই বরাদ্দ কেবল বেঁচে থাকার একটা ক্ষীণ অবলম্বন মাত্র, সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য এটি কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। দৌলতদিয়া ঘাটের জেলে শুকচান হালদারের জীবনের গল্পটাও ঠিক একই রকম হতাশাজনক। তিনি প্রায় আট বছর ধরে প্রমত্তা পদ্মার বুকে মাছ শিকার করে আসছেন।

 

কিন্তু দীর্ঘ এই পেশাদার জীবনে তিনি কখনোই সরকারি খাতায় জেলে হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। ক্ষোভ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার কার্ড না থাকায় তিনি চাল তো পানই না, উপরন্তু অন্য কোনো প্রকার সরকারি বা বেসরকারি সাহায্যও তার ভাগ্যে কখনো জোটেনি।

 

কাজ বন্ধ থাকলে পেট তো আর বন্ধ থাকে না-এই অমোঘ সত্যটি তাকে প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়ায়। ধাওয়াপাড়া ঘাটের আরেক প্রবীণ জেলে ইদ্রিস ব্যাপারীও একই ধরনের অভিযোগ করেন। জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন নদীর বুকে, অথচ আজও তিনি একটি পরিচয়পত্রের অপেক্ষায় আছেন।

 

প্রায় তিন যুগ ধরে মাছ ধরা এই এলাকার সবচেয়ে অভিজ্ঞ জেলেদের একজন সোহেল হালদার। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত একটি সমাধানের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, প্রশাসন যদি জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি এই বাইশ দিনের জন্য কোনো বিকল্প সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, তবে কোনো জেলেই স্বেচ্ছায় আইন অমান্য করে নদীতে নামবেন না।

 

জেলেরা আইন ভাঙতে চায় না, বরং পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করে। পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক সরকারি অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় অর্থনীতি এবং মৎস্য সম্পদের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে মা ইলিশের প্রজননের জন্য এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই বিশেষ সময়ে মা ইলিশকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দেওয়া গেলে আগামী বছরগুলোতে দেশে ইলিশের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত সুফল এই জেলেরাই ভোগ করবেন। তিনি এই জাতীয় কর্মসূচি সফল করতে জেলে সম্প্রদায়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

 

জেলেদের কার্ড না পাওয়া এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বাদ দিয়ে অসাধু ব্যক্তিদের কার্ড পাওয়ার যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন যে প্রতি বছরই জেলে কার্ডের তালিকা হালনাগাদ করার একটি চলমান প্রক্রিয়া রয়েছে।

 

যদি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং প্রমাণসহ কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া, নতুন করে যারা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, তাদেরও যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলে প্রমাণিত হলে কার্ড দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মতো মহৎ উদ্যোগগুলো কেবল আইন প্রয়োগ করে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শতভাগ সফল করা সম্ভব নয়। মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি এর সাথে সরাসরি জড়িত মানবিক দিকটিও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

 

প্রকৃত জেলেদের তালিকা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুর্নীতিমুক্তভাবে হালনাগাদ করা, শুধুমাত্র চাল নয় বরং একটি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই কর্মহীন সময়ে জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

 

সংরক্ষণ আর জীবনসংগ্রামের এই দ্বন্দ্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই কেবল পারে জাতীয় সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে। অন্যথায়, পেটের দায়ে আইন অমান্য করার যে প্রবণতা, তা দমন করা প্রশাসনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।