সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০২ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা প্রদান করলেন প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

১০২ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা প্রদান করলেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

একটি জাতির মেধা, মনন ও বৌদ্ধিক বিকাশের প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক। সমাজের প্রতিটি স্তরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়ে যারা একটি সুশিক্ষিত, আধুনিক ও আদর্শ জাতি গঠনে আজীবন নিরলস পরিশ্রম করে যান, তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের আনুষ্ঠানিক ও সর্বোচ্চ স্বীকৃতি প্রদান করেছে রাষ্ট্র।

 

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের মোট ১০২ জন অসামান্য গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করেছে সরকার।

 

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের এই বরেণ্য শিক্ষাবিদদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মাপকাঠিতে বিচার করলে, রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে শিক্ষকদের এমন সম্মাননা প্রদান নিঃসন্দেহে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের দায়বদ্ধতা ও গভীর শ্রদ্ধারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল উদ্যোগে আয়োজিত এই মহতী অনুষ্ঠানে দেশের আনাচে-কানাচে থেকে আসা আলোকিত মানুষগুলোর এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন।

 

জীবনভর যারা কেবল সমাজকে দিয়েই গেছেন, তাদের সেই নিঃস্বার্থ অবদানের প্রতি রাষ্ট্রের সামান্য কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রত্যেক গুণী শিক্ষককে দুই লাখ টাকার আর্থিক অনুদান, একটি সুদৃশ্য সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়।

 

এই সম্মাননা কেবল একটি আর্থিক পুরস্কার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও তাদের আজীবন সাধনার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। শিক্ষকরা তাদের অগাধ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ দিয়ে যে অগণিত শিক্ষার্থীকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, সেই মহৎ কর্মযজ্ঞের প্রতি গোটা জাতির সশ্রদ্ধ অভিবাদন যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

 

দুপুর ঠিক দুইটায় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মূর্ছনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর দেশের সব ধর্মের মানুষের প্রতি সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধার অনন্য নিদর্শনস্বরূপ পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে পাঠ করা হয়, যা পুরো মিলনায়তনে এক পবিত্র ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি করে।

 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তার প্রাঞ্জল ও দিকনির্দেশনামূলক স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা, কাঠামোগত সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রতি বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

 

অনুষ্ঠানটির মঞ্চ বিশেষ অতিথি হিসেবে অলংকৃত করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

 

এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত থেকে শিক্ষকদের অপরিমেয় ত্যাগ ও মহান আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ তাদের বক্তব্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেন।

 

এই বিরল সম্মাননার জন্য দেশের গুণী শিক্ষকদের নির্বাচন করার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কাঠামোগতভাবে সুদৃঢ়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে পৃথক পৃথক বিচারক প্যানেল ও অত্যন্ত দক্ষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।

 

এই অনুসন্ধান কমিটিগুলো দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শ শিক্ষকদের অতীত ইতিহাস ও অবদানের তথ্য সংগ্রহ করে এবং দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্তভাবে এই ১০২ জনকে সম্মাননার জন্য মনোনীত করে।

 

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বমোট দশটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়, যাতে করে শিক্ষার কোনো শাখাই রাষ্ট্রের এই মহতী স্বীকৃতি থেকে বাদ না পড়ে।

 

প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকাটি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছর সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে এমন সব প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ রয়েছেন, যাদের নাম বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রয়াত অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়।

 

পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রখ্যাত গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানের বিশ্ববরেণ্য গবেষক প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলামকে (মরণোত্তর) এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদান ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রখ্যাত নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ শল্যচিকিৎসক সাবেক অধ্যাপক ডা. এম এ মাজেদ (মরণোত্তর) এবং বরেণ্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার এই বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেন।

 

অপরদিকে, দেশের প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান (মরণোত্তর) এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. এ. বি. এম. হারুন-উর-রশিদকে আজীবন সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

 

এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা তাদের নিজ নিজ গবেষণার ক্ষেত্রে কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের সম্মান বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন। উচ্চশিক্ষার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের পাশাপাশি এই আয়োজনে এমন কয়েকজন নিভৃতচারী ও নিঃস্বার্থ শিক্ষাব্রতীকে সম্মানিত করা হয়েছে, যাদের আত্মত্যাগের জীবনকাহিনি যেকোনো মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করতে বাধ্য।

 

বিশেষ বিভাগে সম্মাননা পাওয়া এমনি একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন মো. লুৎফর রহমান, যিনি দেশজুড়ে 'এক টাকার শিক্ষক' হিসেবে সর্বজনবিদিত। ১৯৭৪ সালের পর থেকে তিনি সমাজের অবহেলিত, প্রান্তিক ও দরিদ্র শিশুদের মাঝে নামমাত্র এক টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছেন।

 

জাগতিক অর্থের মোহ ত্যাগ করে একটি আদর্শ সমাজ গড়ার এই নীরব কারিগর রাষ্ট্রের এই সম্মাননায় আজ এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। একইভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখা 'রমনী কান্ত পাঠশালা'-এর প্রতিষ্ঠাতা রমনী কান্ত বেপারীও নিজ গুণের স্বীকৃতিস্বরূপ এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অর্জন করেছেন।

 

এছাড়াও সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অবহেলা থেকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে নিরলস কাজ করে যাওয়া প্রয়াস বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খান এই বিরল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

 

এই নিভৃতচারী মহান শিক্ষকরা সমগ্র জাতির সামনে এ কথাই প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল সদিচ্ছা, সততা ও মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থাকলে যেকোনো কঠিন প্রতিকূলতার মাঝেই শিক্ষার আলো অনন্তকাল জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব।

 

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্য থেকে কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। এ সময় পুরো মিলনায়তন জুড়ে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

 

তারা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নিজেদের আরও নিবিড়ভাবে বিলিয়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

পরিশেষে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সমাপনী ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি তার ভাষণে শিক্ষকদের জাতির সত্যিকারের পথপ্রদর্শক ও আলোকবর্তিকা হিসেবে অভিহিত করেন এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষকদের আরও অগ্রণী ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

রাষ্ট্রীয় এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক সমাজের প্রতি যে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা হলো, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনে দেশের শিক্ষা খাতকে আরও গতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।