সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবার জন্য টেকসই ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে - প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

সবার জন্য টেকসই ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে - প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

টেকসই ও নিরাপদ আবাসন কেবল একটি সাধারণ মাথার ওপর ছাদ বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের সম্মানজনক জীবনধারণের অপরিহার্য শর্ত ও সাংবিধানিক অধিকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব বসতি দিবসের সার্বিক তাৎপর্য নিছক চারটি দেয়াল কিংবা একটি ঘরের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে মানুষের মানবিক মর্যাদা, নাগরিক জীবনের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা এবং সামগ্রিক জনকল্যাণ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

 

টেকসই ও মানসম্পন্ন নাগরিক জীবনের রূপরেখা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আধুনিক সভ্যতায় টেকসই বাসস্থান বলতে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ, আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সুশৃঙ্খল যোগাযোগ ও নিরাপদ সড়ক পরিকাঠামোকে বোঝায়।

 

এর পাশাপাশি প্রতিটি জনপদে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও টেকসই আবাসনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। নাগরিক সমাজের জন্য মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার অনুকূল এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলাই মূলত যেকোনো রাষ্ট্রের কল্যাণকর আবাসন নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

 

দেশের সার্বিক জনমিতিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের উন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য সব নাগরিকের মৌলিক আবাসন সুবিধা সুনিশ্চিত করা যতটা সহজসাধ্য, বাংলাদেশের মতো উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য অর্জন ততটাই জটিল ও চ্যালেঞ্জিং।

 

তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আত্মমর্যাদা বজায় রেখে টেকসইভাবে টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে বিদ্যমান প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা কার্যকরভাবে অতিক্রম করতে হবে।

 

পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের জন্য কেবল একটি সাধারণ মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করাই শেষ কথা নয়, বরং সেই বাসস্থানকে পরিবেশসম্মত, ঝুঁকিহীন, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ও জরুরি জাতীয় দাবি।

 

দেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগরায়ণের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রধান প্রধান নগর, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতিনিয়ত মানুষের বসতি এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের চাপ অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, জাতীয় রাজধানী ঢাকা বর্তমানে ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত জনাকীর্ণ এক মহানগরে পরিণত হয়েছে, যা নাগরিক পরিষেবার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও শিল্পপ্রধান শহরগুলোর সার্বিক অবস্থাও রাজধানীর চেয়ে খুব একটা ভিন্ন নয়।

 

শহরাঞ্চলের অধিকাংশ স্থানেই প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষ ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এই ধরনের জটিল ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাসস্থান এবং সুপরিকল্পিত টেকসই নগরায়ণের ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।

 

প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব, আধুনিক ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও সবুজ নগর পরিকাঠামো গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং এক অপরিহার্য জাতীয় দায়িত্ব।

 

বাস্তবায়নের কঠিন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে সরকারপ্রধান অভিমত প্রকাশ করেন, কার্যকর নগর সংস্কার বা সর্বজনীন বাসস্থানের কথা মুখে বলা যতটাই সাবলীল মনে হোক না কেন, দেশের বিদ্যমান আর্থিক, ভৌগোলিক ও কাঠামোগত বাস্তবতায় তা বাস্তবে রূপদান করা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও কঠিন এক কর্মযজ্ঞ।

 

তবে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সর্বজনীন আবাসন ব্যবস্থা এবং পরিবেশসম্মত সুষম নগরায়ণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সকল সম্ভাব্য কার্যকর পদক্ষেপ ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং প্রয়োজনীয় মৌলিক নাগরিক সেবাসংবলিত টেকসই আবাসন অধিকার মূলত দেশের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক মানবিক অধিকার।

 

এই মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানকে বৈষম্যহীনভাবে সমুন্নত রাখতে বর্তমান সরকার নীতিগতভাবে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আপসহীন। প্রধানমন্ত্রী আরও সুস্পষ্ট করেন যে, একটি সুপরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকাঠামো গড়ে তোলাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধানতম লক্ষ্য।

 

বিশেষ করে সমাজের অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর, নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার সংস্থান রাখা সরকারি নীতিমালার কেন্দ্রীয় বিবেচনায় স্থান পেয়েছে।

 

প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দেশজুড়ে সুষম পরিকল্পিত নগরায়ণ বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

 

এই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে সরকারপ্রধান উল্লেখ করেন। সুষম নগরায়ণের ভিত্তি রচনার উদ্দেশ্যে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

 

স্থানীয় পর্যায়ে নগর পরিকল্পনাকে আরও দক্ষ ও বিকেন্দ্রীভূত করার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে পৃথক নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।

 

সরকারের প্রত্যাশা, এই সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে স্থানীয় স্তরে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, যেকোনো দুর্যোগ সহনশীল ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নগর গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১ নম্বর অভীষ্ট অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই মানব বসতি গড়ে তোলার আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জন বাংলাদেশের জন্য বহুগুণ সহজতর হবে।

 

শহরাঞ্চলের ওপর ক্রমবর্ধমান জনচাপ হ্রাস করার বহুমুখী পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বহুমুখী বিকল্প কৌশল নিয়ে ময়দানে নেমেছে। রাজধানী ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলোর সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও দ্রুতগতির, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

এর সমান্তরালে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করে শহরমুখী জনস্রোত রোধ করার পরিকল্পনাকে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

সরকার কেবল রাজধানী এবং কয়েকটি প্রধান মহানগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যগত কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। জাতীয় উন্নয়নের সামগ্রিক সুফল দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সুষমভাবে পৌঁছে দিতে নানাবিধ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

সরকারের লক্ষ্য একমুখী নগরায়ণ নয়, বরং ক্ষমতার সুষম বণ্টন ও আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বিত জাতীয় অগ্রগতি। এই নীতিমালার আলোকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সমগ্র দেশের জন্য স্থানিক ভৌগোলিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ঢাকার অতিরিক্ত চাপ সামলাতে রাজধানীর চারপাশে সুপরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব সহযোগী উপশহর গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা পুরোদমে এগিয়ে চলছে।

 

আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, নদী, খাল, জলাশয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আঞ্চলিক নগর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয়, জেলা এমনকি উপজেলা স্তর পর্যন্ত সুপরিকল্পিত আবাসিক অঞ্চল সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

 

চলমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে যেমন বহুমুখী প্রতিকূলতা ও জটিল চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে, তেমনি নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মোচিত করেছে।

 

পরিবর্তিত এই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে নগর এলাকার বিদ্যমান বহুমুখী আবাসন সংকট মোকাবিলায় এবং সর্বজনীন বাসস্থানের লক্ষ্য অর্জনে সকল নীতি ও প্রকল্প অত্যন্ত দ্রুততা, সততা এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নে সরকার তার সর্বাত্মক আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

 

শহরাঞ্চলের তীব্র আবাসন সংকট সমাধানের জন্য কেবল সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশীদারত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

তিনি বলেন, দেশের আবাসন খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তা, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং অন্যান্য অংশীজনদের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ সংকট উত্তরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের পরিবর্তে আধুনিক গুচ্ছভিত্তিক সুবিন্যস্ত আবাসন ব্যবস্থাকে সরকার সর্বোচ্চভাবে উৎসাহিত করছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি জনপদে এলাকাভিত্তিক সবুজ পার্ক, উন্মুক্ত খেলার মাঠ, উন্মুক্ত জলাধার স্থাপন এবং সুনির্দিষ্ট সুরক্ষিত বলয়ে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সমন্বিত প্রয়াস জোরদার করা হয়েছে।

 

সরকার ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি এই রূপরেখা ও নীতিপরিকল্পনাগুলো যদি যথাযথ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাশীল ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করা কেবল একটি স্বপ্ন হিসেবে থাকবে না, বরং তা সমগ্র জাতির সামনে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বাস্তবতায় রূপ নেবে।