রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্যে যুক্তরাজ্যের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত থাকবে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্যে যুক্তরাজ্যের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত থাকবে
ছবি: সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের পরও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য এক বড় সুখবর নিয়ে এসেছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাজ্য।

 

অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকসহ মোট ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে অবাধ ও শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের সুবিশাল বাজারে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে আসছে। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের পর প্রাথমিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত এই চলমান সুবিধা সম্পূর্ণভাবে অব্যাহত থাকবে এবং এরপরও ৯২ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে।

 

রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য প্রদানকালে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক বাণিজ্য বার্তার কথা তুলে ধরেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য সব সময়ই বাংলাদেশের অন্যতম অকৃত্রিম বন্ধু ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনার তাঁর বক্তব্যে এই ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা স্মরণ করে বলেন, যুক্তরাজ্যের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক গন্তব্য নয়, বরং একটি অত্যন্ত কৌশলগত ও বিশ্বস্ত অংশীদার।

 

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক এবং তা একটি পরিপক্ব কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে।

 

এই অভূতপূর্ব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, যা যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাকে কয়েক দশক ধরে গভীরভাবে সংযুক্ত করে রেখেছে।

 

দীর্ঘদিনের এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুফল হিসেবে যুক্তরাজ্য বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিটি ধাপে-বিশেষ করে আধুনিক আর্থিক খাত, ফ্যাশন ও তৈরি পোশাক শিল্প, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে-ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিরলসভাবে তাদের কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা ও বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

 

এর ফলে বাংলাদেশে যেমন বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদও বৈশ্বিক মানদণ্ডে অনেক বেশি মজবুত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা যেন কোনোভাবেই হোঁচট না খায় বা রপ্তানি আয়ে ধস না নামে, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্যের আন্তরিকতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সারাহ কুক।

 

বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের পর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে সফল উত্তরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, তখন যুক্তরাজ্যের মূল লক্ষ্য হলো এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় মসৃণ, ঝুঁকিহীন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলা।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের প্রবর্তিত ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ বা ডিসিটিএস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সহজ, নমনীয় এবং উদার একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ব্যবস্থা হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত।

 

এই স্কিমের আওতায় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও বাংলাদেশ এমন সব কাঠামোগত বাণিজ্য সুবিধা লাভ করবে, যা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্ববাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

 

এর ফলে যুক্তরাজ্যের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ধারা কেবল অক্ষুণ্ণই থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে তা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়টিও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বক্তব্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ঢাকা ও লন্ডনের মধ্যকার বর্তমান নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং তা গভীর পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং অভিন্ন বৈশ্বিক লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে।

 

বর্তমান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় একটি সম্পূর্ণ অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং সব পক্ষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ উভয়েরই গভীর ও অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।

 

বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে একটি স্থিতিশীল সমুদ্রাঞ্চল বজায় রাখা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অপরিহার্য দায়িত্ব ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকার করে।

 

আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই প্রথাগত সামরিক ধারণার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক বিশ্বের নতুন চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সারাহ কুক। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান যুগে কেবল সামরিক বা সীমান্ত নিরাপত্তাই শেষ কথা নয়; বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকি মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মারাত্মক ঝুঁকির মতো আধুনিক ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রথাগত গণ্ডি বা সীমানা ছাড়িয়ে দুই দেশকে আরও বেশি সমন্বিত, আধুনিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসা দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের যখন মনোযোগ ক্রমশ অন্যদিকে সরে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই চরম অনিশ্চিত সময়ে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত জোরালো এক মানবিক প্রতিশ্রুতি।

 

ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, মিয়ানমার থেকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ নিরাশ্রয় রোহিঙ্গার এই চরম মানবিক সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ ধরে রাখতে যুক্তরাজ্য সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধু তা-ই নয়, এই দীর্ঘায়িত ও জটিল সংকটের একমাত্র যৌক্তিক ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্বমঞ্চে কাজ করে যাওয়ার বিষয়েও লন্ডন তাদের দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছে।

 

যুক্তরাজ্যের মতে, এই সংকটের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধান হলো-মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূল হলে, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বাসভূমিতে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, সর্বোচ্চ নিরাপদে এবং পূর্ণ মানবিক মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসন করা।

 

সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিপুল বোঝা বহনকারী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে সব ধরনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা প্রদানে যুক্তরাজ্য সব সময় পাশে থাকবে বলে দৃঢ় আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

 

বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান এজেন্ডা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভাবনীয় সংগ্রামের কথাও গভীর সমবেদনা ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার।

 

তিনি তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনকে এমন একটি ভয়াবহ ও দৃশ্যমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থ সম্পূর্ণ অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য।

 

তিনি অত্যন্ত বাস্তবমুখী একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির নির্মম বাস্তবতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে ভালোভাবে বিশ্বের খুব কম দেশই অনুধাবন করতে পারে।

 

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ রাষ্ট্রটিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার চিরচেনা ধরনগুলোর আকস্মিক ও চরম পরিবর্তন এবং প্রবল ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির ধ্বংসাত্মক প্রভাব এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক সেমিনারে আলোচিত বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ তাত্ত্বিক বিষয় নয়।

 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের, বিশেষ করে অরক্ষিত উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যেই এর নিষ্ঠুর ও প্রত্যক্ষ প্রভাব নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রবলভাবে অনুভব করছে। কার্যকর কোনো সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহ ফলাফল আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্মের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলবে বলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়োজনে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো মূলত সমসাময়িক এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকটগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার এক অনন্য সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা আগামী দিনের একটি স্থিতিশীল, উন্নত ও নিরাপদ বিশ্ব বিনির্মাণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।