হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া এই অগ্নিকাণ্ডে কারখানা প্রাঙ্গণে চরম আতঙ্ক ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের একাধিক আঞ্চলিক কার্যালয়ের অগ্নিনির্বাপক দল।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার ফাইটাররা। এই ঘটনায় কারখানার ভেতরে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়া এবং তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা অন্তত ৭০ জন শ্রমিককে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জীবিত উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্থানীয় বিবরণ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, শনিবার অপরাহ্ণে প্রতিদিনের মতোই মেট্রিক্স গার্মেন্টসের বিভিন্ন তলার উৎপাদন কক্ষে স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছিল। ঠিক সে সময় সাততলা বিশিষ্ট ভবনটির তৃতীয় তলায় অবস্থিত প্রধান ফেব্রিক্স বা কাপড়ের গুদামে আকস্মিকভাবে আগুন ও ক্ষতিকারক ধোঁয়া দেখতে পান সেখানে কর্মরত কর্মীরা।
মুহূর্তের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত এই আগুন দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এসে চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো গুদাম এলাকা বিষাক্ত ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কারখানাটির ওই তলাটিতে বিপুল পরিমাণ ওভেন, নিট ফ্যাব্রিক্স ও সুতার বৃহৎ মজুদ সংরক্ষিত থাকার কারণে আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভবনের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগুন রোখার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হলেও বিষাক্ত ধোঁয়া ও উত্তাপের কারণে শ্রমিকরা দ্রুত নিরাপদে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালান। এর ফলে কারখানার সিঁড়ি ও জরুরি নির্গমন পথগুলোতে সাময়িক বিশৃঙ্খলা ও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়।
ঘটনার ভয়াবহতা ও পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি লক্ষ্য করে কারখানা কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যোগাযোগ করে। সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় গাজীপুর চৌরাস্তা মডার্ন ফায়ার স্টেশনের তিনটি বিশেষায়িত ইউনিট।
তবে কারখানার অভ্যন্তরীণ ফেব্রিক্সের গুদামে থাকা বিপুল পরিমাণ তন্তুর কারণে আগুনের শিখা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বিষাক্ত ধোঁয়া দ্রুত ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সার্বিক ভয়াবহতা বিবেচনা করে আশপাশের অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো থেকে জরুরি সহায়তা পাঠানোর অনুরোধ জানায় ফায়ার সার্ভিসের স্থানীয় নেতৃত্ব।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে একে একে যুক্ত হয় কোনাবাড়ি ফায়ার সার্ভিসের একটি, গাজীপুর ফায়ার স্টেশনের আরও তিনটি এবং রাজেন্দ্রপুর ফায়ার স্টেশনের দুটি সুসজ্জিত অগ্নিনির্বাপক দল।
সর্বমোট নয়টি বিশেষায়িত ইউনিটের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি বিশাল এলাকাজুড়ে চারদিক থেকে সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে অগ্নিনির্বাপণ কাজ শুরু করা হয়। অগ্নিকাণ্ড চলাকালীন সময়ে বহুতল ভবনের অভ্যন্তরে আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষা প্রদান করাই ছিল উদ্ধারকারী দলের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক সাইদুল আলম চৌধুরী ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ দিয়ে জানান যে, সাততলা ভবনটির মূলত তৃতীয় তলায় পোশাকের গুদামজাত উপকরণ থেকেই অগ্নিকাণ্ডটির উৎপত্তি ঘটে। কাপড়ের সুতা পোড়ার ফলে সৃষ্ট ঘন ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় কারখানার অভ্যন্তরীণ বাতাসের গুণগত মান দ্রুত বিনষ্ট হয় এবং তা চরম শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে।
এর ফলে তৃতীয় তলাসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে কাজ করতে থাকা প্রায় ৭০ জন শ্রমিক মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ও জীবন ঝুঁকিতে পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত সতর্কতা ও দ্রুততার সাথে শ্বাসযন্ত্রের বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে অগ্নিকূপের মধ্য থেকে অসুস্থ শ্রমিকদের নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসে।
উদ্ধারকৃত শ্রমিকদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। বিকেল তিনটা থেকে শুরু হওয়া এই অগ্নিকাণ্ড দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ফায়ার ফাইটারদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে সামগ্রিক উদ্ধার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানান যে, আপ্রাণ চেষ্টার ফলে আগুনকে ভবনের অন্যান্য তলা বা আশপাশের স্থাপনায় ছড়ানো থেকে আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তবে তিনি অগ্নিনির্বাপণের পরিভাষায় পরিস্থিতি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আগুনের বিস্তার ‘নিয়ন্ত্রণে আনা’ এবং আগুন ‘সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা’ দুটি পৃথক বৈজ্ঞানিক ও পরিচালনাগত প্রক্রিয়া।
আগুনের নতুন শিখা তৈরি হওয়া বন্ধ করা গেলেও ভবনের অভ্যন্তরে বিশালাকার কাপড়ের গুদাম থাকার কারণে ঘন কাপড়ের স্তূপের নিচে সুপ্ত উত্তাপ রয়ে গেছে। তাই আগুন দৃশ্যমানভাবে নিয়ন্ত্রণে আসলেও পুরো ভবনটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ড্যাম্পিং ডাউন বা চূড়ান্ত নির্বাপণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
উপ-পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদ আরও জানান, বস্ত্র ও ফেব্রিক্সের স্তূপগুলো সরানোর সময় ভেতরে জমাবদ্ধ হয়ে থাকা উচ্চ উত্তাপ ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে পুনরায় ক্ষণিকের জন্য আগুনের উন্মেষ ঘটতে পারে। এই কারণে ফায়ার সার্ভিসের অভিজ্ঞ কর্মীরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে পর্যায়ক্রমে সুতা ও কাপড়ের বিশাল গাদাগুলো সরাচ্ছেন এবং সেগুলোতে নিবিড়ভাবে পানি স্প্রে করছেন।
আগুনের সামান্যতম অবশিষ্ট অংশ যাতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়, সে লক্ষ্যেই বর্তমানে ফায়ার ফাইটাররা কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, মূল গুদামের ভেতর জমে থাকা কাপড়ের পাহাড় সরাতে বেশ খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হবে।
এর পাশাপাশি ভবনের প্রতিটি কক্ষে আরও কোনো শ্রমিক বা কর্মচারী আটকে আছেন কিনা, অথবা এই ঘটনায় নতুন করে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক তল্লাশি ও খতিয়ে দেখার কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত জাতীয় অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এই কারণে শিল্পাঞ্চলের যেকোনো দুর্ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পর্যালোচিত হয়।
গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় সুতা, কেমিক্যাল ও বিভিন্ন প্রকার কাপড়ের বিশাল মজুদের কারণে একটি ছোট অসাবধানতাও মারাত্মক শিল্প বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আধুনিক শিল্প নিরাপত্তা বিধিমালার আওতায় বর্তমান পোশাক কারখানাগুলোতে জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা ও প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও ঘন বসতিপূর্ণ ও সংবেদনশীল গুদামগুলোতে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
কারখানার অভ্যন্তরে দ্রুত ধোঁয়া নিষ্কাশন ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, আজকের ডেগেরচালার ঘটনাটি শিল্প নিরাপত্তার সেই প্রয়োজনীয়তাকে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই কারখানা প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের প্রধান সড়কগুলোতে উৎসুক জনতা ও শ্রমিকদের উদ্বেগাকুল স্বজনদের ভিড় জমে যায়। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়িগুলোর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে স্থানীয় থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ যৌথভাবে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে।
অগ্নিনির্বাপণ দলের দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়ক পরিবহন শৃঙ্খলায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারাও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পানির উৎস অনুসন্ধানে এবং প্রাথমিক উদ্ধার কাজে মানবিক সহায়তা প্রদান করেন।
গাজীপুর চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি ও রাজেন্দ্রপুর ফায়ার স্টেশনের সুসংগঠিত দলগুলোর সমন্বিত ভূমিকার কারণেই একটি সম্ভাব্য বড় মাপের প্রাণহানি ও শিল্প সম্পদের চরম ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়ায় বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়ে যেসব শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই প্রাথমিক অক্সিজেন থেরাপি এবং ফার্স্ট এইডের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্ত্র কারখানায় ব্যবহৃত কৃত্রিম তন্তু বা ফেব্রিক্স পোড়ার সময় বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর ধূলিকণা মিশে যায়, যা দ্রুত মানবদেহের ফুসফুসে প্রবেশ করে সাময়িক অচেতনতা ও চরম শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে।
ফায়ার সার্ভিসের চৌকস উদ্ধারকারী দল সময়মতো ভবনের ভেতরে প্রবেশ না করলে এসব শ্রমিকের ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারত। সময়োপযোগী এই উদ্ধার তৎপরতার ফলে বড় কোনো জীবনহানি না ঘটায় কিছুটা হলেও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
বর্তমানে মেট্রিক্স গার্মেন্টস কারখানার অগ্নিকাণ্ডস্থল ফায়ার সার্ভিসের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে রয়েছে এবং পুরোপুরি নির্বাপণ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে একাধিক ইউনিট পাহারায় থাকবে। অগ্নিকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ-তা কি কোনো বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে উৎপন্ন হয়েছে নাকি অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দায়ী-তা উদঘাটনে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তদন্তকারী দল কারখানার অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা, ভবনের নকশা এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর নিয়মিত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করবে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় নির্ধারণে স্থানীয় প্রশাসন ও শিল্প পুলিশ কারখানার তদারকি ত্বরান্বিত করেছে।