তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জনগণ যে বিশাল আস্থা ও প্রত্যাশা নিয়ে বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে, তার সর্বোচ্চ মর্যাদা রক্ষা করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে, ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল ও জনবহুল অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে সরকারপ্রধান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই দিন তিনি ওই অঞ্চলে স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’-এর আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি সমবেত হাজারো জনতার উদ্দেশে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বছরের পর বছর ধরে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে এসেছেন।
বিগত প্রায় ১৭ বছরের শাসনকালকে তিনি ‘স্বৈরাচারী আমল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে উল্লেখ করেন যে, ওই দীর্ঘ সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল এবং তাদের সকল প্রকার গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী গভীর আক্ষেপের সঙ্গে স্মরণ করেন যে, বিগত শাসনামলে মানুষকে তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, সাধারণ মানুষের সীমাহীন কষ্ট ও দুর্দশা দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সেসময় মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা ন্যূনতম সহানুভূতির সঙ্গে শুনতেও চায়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ সেই দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারকে দেশ থেকে চিরতরে বিদায় করেছে।
পরবর্তীতে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশের সাধারণ জনগণ একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) দেশ পরিচালনার বিশাল দায়িত্ব প্রদান করেছে।
এই বিপুল জনসমর্থন ও ম্যান্ডেটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রতিশ্রুতি দেন যে, যেহেতু দেশের মানুষ বিএনপিকে এই পরম আস্থার সঙ্গে দায়িত্ব দিয়েছে, সেহেতু দল ও সরকার তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এটা নিশ্চিত করবে যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য আইন সম্পূর্ণ সমানভাবে কাজ করে।
বিগত ১৭ বছরে দেশের আইনের শাসনকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ভূলুণ্ঠিত ও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও কার্যকর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে অত্যন্ত বদ্ধপরিকর।
দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছু রাজনৈতিক দলের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেশের কিছু কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশব্যাপী একটি অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, সরকার সাধারণ মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড প্রবর্তন করেছে, কৃষিকাজ ও পানিনিষ্কাশনের সুবিধার জন্য দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর আধুনিকায়ন করছে এবং দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মিল-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল যদি এই জনকল্যাণমূলক কাজগুলোতে বিঘ্ন ঘটায় বা নাশকতা সৃষ্টি করে, তবে তার চূড়ান্ত ক্ষতি কোনো বিদেশি শক্তির হবে না, বরং এই দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষেরই অপূরণীয় ক্ষতি হবে বলে তিনি গভীরভাবে সতর্ক করেন।
বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘রাজনৈতিক দল’ ও ‘গুপ্তদল’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তাদের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন।
তিনি সমবেত জনতার স্মৃতিচারণ করে বলেন, যারা আজ দেশে নতুন করে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা দেশের মানুষের খুব ভালোভাবে মনে আছে।
তিনি অভিযোগ করেন যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা যেভাবে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্ন অন্যায়-অত্যাচার করেছিল এবং নিরীহ মা-বোনদের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন ও হয়রানি চালিয়েছিল, ঠিক একইভাবে আজও তাদের সেই পুরোনো রূপ ফিরে এসেছে এবং নতুন করে নারী নির্যাতন শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই তথাকথিত গুপ্তবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য সম্প্রতি কীভাবে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে তা দেশবাসী দেখেছে। শুধু নির্যাতন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং একটি জলজ্যান্ত মানুষের জীবনাবসান বা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধও তারা সংঘটিত করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তদন্তাধীন থাকায় তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন, যা তার আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় ওই গুপ্তদলের নেতাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়াতে দেখা যাচ্ছে যে, ওই দলগুলোর নেতারা সরকারকে প্রতিনিয়ত অযাচিত নসিহত বা উপদেশ দিচ্ছেন এবং কী করতে হবে বা না হবে তার নির্দেশনা দিচ্ছেন।
ফেনীর ওই জনসভায় হাজারো উপস্থিত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ওই সমালোচকদের উদ্দেশে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তারা যেন সরকারকে উপদেশ দেওয়ার আগে দয়া করে নিজেদের ঘরের দিকে তাকান এবং নিজেদের আত্মশুদ্ধি করেন।
তাদের নিজেদের দলের লোকেরা ও অনুসারীরা যেভাবে দেশব্যাপী নারী নির্যাতন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, আগে সেটি কঠোরভাবে সামাল দেওয়ার জন্য তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান। নিজের ঘর সামলে তারপর অন্যকে নসিহত করতে আসার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ও পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।
এই বিশাল বাজেটের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেনীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন এবং সারা বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কৃষিকাজ পরিচালনা করতে পারবেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর এলাকায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির সফল সমাপ্তির পর, প্রধানমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত ও ধারাবাহিক সফরের অংশ হিসেবে ফুলগাজী উপজেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
তিনি বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে একটি পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন, যা পরিবেশ রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকারের একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
এরপর তিনি জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ছাদে স্থাপিত রুফটপ সোলার বা সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল থেকে উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার যুগান্তকারী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী এই সফরের শেষাংশে বিকেলে তিনি ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে যোগ দেবেন বলে নির্ধারিত ছিল। সেখানে তিনি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দরিদ্র পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের মাঝে কৃষক কার্ড বিতরণ করবেন।
একই সঙ্গে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন মসজিদের সম্মানিত ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের হাতে সরকারি সম্মানী বা ভাতা প্রদান কর্মসূচিতেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং সুশাসিত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তার এই সফর ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ও ইতিবাচক মাত্রার সঞ্চার করেছে।