বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কমিশন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কমিশন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সুষ্ঠু পরিচালনা কৌশল পর্যালোচনার কাজ জোরদার করেছে। আগামী জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যের ধারাবাহিকতায়, দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা মূল্যায়ন করছে।

 

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় অবস্থিত নির্বাচন ভবনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিনিধিদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এ কথা জানান।

 

তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন দেশের বিদ্যমান সামাজিক পরিবেশ এবং প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে একটি বাস্তবসম্মত ও সুসংহত সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

তৃণমূল পর্যায়ের এই ব্যাপকভিত্তিক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নানাবিধ বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব জানান, নির্বাচনী সময়সূচি নির্ধারণ কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড।

 

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষা, পবিত্র রমজান মাস এবং বিভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় ছুটির দিনগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতাগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

 

কমিশন এমন একটি নমনীয় ও সমন্বিত নির্বাচনী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কোনো ধরনের বাধা না সৃষ্টি করে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে উৎসাহিত করবে।

 

এই সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবে কমিশন সমস্ত অংশীজনের সুবিধা পর্যালোচনা করে সময়সূচি নির্ধারণে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়েও আলোকপাত করেন সচিব আখতার আহমেদ।

 

তিনি জানান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির প্রস্তাবিত ‘ব্যালট’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রাথমিক প্রস্তাব নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।

 

বর্তমান আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নির্বাচনের প্রধানতম হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ভুল তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য ছড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধ করার কৌশল রপ্ত করানোই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

 

এটি একক কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনের জন্য ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক অবকাঠামোকে সুসংহত করার লক্ষ্যে একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে রূপদান করা হয়েছে।

 

ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্যের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সাধারণ ভোটারদের রক্ষা করা আন্তর্জাতিক নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন বিশ্বাস করে যে, গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হলে নির্বাচনের সময় সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজতর হবে।

 

তবে প্রস্তাবটি বর্তমানে অতি প্রাথমিক পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে বলে সতর্কতার সাথে উল্লেখ করেন সিনিয়র সচিব। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে বিস্তৃত ও গভীর আলোচনার ভিত্তিতে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অংশগ্রহণকারীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বিগত সময়গুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বিষয়ে কমিশনের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নির্বাচনী সময়সূচি, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রস্তাবনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।

 

উক্ত আলোচনার ধারাবাহিকতায় নির্বাচনকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত করতে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী বা সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে কি না, সে বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

 

নির্বাচন কমিশন মনে করে, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আঞ্চলিক ঝুঁকির মাত্রা এবং স্থানীয় সামাজিক পরিবেশ গভীরভাবে মূল্যায়ন করার পরেই কেবল নিরাপত্তা সংক্রান্ত চরম বা চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

জনগণের আস্থা বজায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সফল নির্বাচনের দৃষ্টান্ত টেনে আনেন সচিব আখতার আহমেদ। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির সুষ্ঠু, অবাধ ও সফল নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের যে বিপুল আস্থা ও উচ্চ মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, কমিশন তা কেবল ধরে রাখতেই বাধ্য নয়, বরং সেই মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

দেশের প্রতিটি ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, ভোটকেন্দ্রগুলোর ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা এবং প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জামাদি যথাযথ সময়ে সরবরাহ করার সার্বিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে।

 

একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বিধাহীন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার যে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসৃত হয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনও সেই পথেই হেঁটে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করতে চায়।

 

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বাংলাদেশেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে তেমনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

 

স্থানীয় সরকারের মূল ভিত্তি এই ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সঠিক সময়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হলে তা যেমন তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করবে, তেমনি দেশের সার্বিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক নতুন মাত্রার যোগান দেবে।

 

এই লক্ষ্য অর্জনে কমিশন কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কৌশলগত ত্রুটি না রেখে একটি সুসংগঠিত, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। পরিশেষে, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তারা কেবল প্রথাগতভাবে ভোট গ্রহণের আয়োজক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে না, বরং আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণে মনোযোগ দিচ্ছে।

 

জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পেশাদার অংশীদারত্ব, স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি পরম শ্রদ্ধা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সময়োপযোগী বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে কমিশন একটি নতুন নজির স্থাপন করতে চাইছে।

 

দেশের সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পর নির্বাচন কমিশনের এই সতর্ক ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি একটি শান্তিপূর্ণ ও অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথকেই প্রশস্ত করবে। কমিশনের এই অব্যাহত প্রয়াস আগামী দিনে দেশে একটি সমৃদ্ধ, অবাধ ও টেকসই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।