বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত কড়া নির্দেশিকা পাঠিয়েছে। বিএফআইইউর একজন দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তার কার্যালয়ে ঘটিত ভাঙচুরের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং পরবর্তীতে তার বিভিন্ন বক্তব্যের জের ধরে এই আর্থিক তদন্তের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা দেশের ডিজিটাল মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বিএফআইইউর পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠানো অফিসিয়াল ই-মেইল বার্তায় সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সব ব্যাংক হিসাবের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তলব করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে তার হিসাব খোলার ফরম তথা অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্ম, গ্রাহক পরিচিতি বা নো ইউর কাস্টমার সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এবং হিসাবের বিস্তারিত বিবরণী বা স্টেটমেন্ট। এছাড়া তার নামে পরিচালিত হিসাবগুলোর কেওয়াইসি ফর্ম এবং লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণীর সফটকপি দ্রুত সময়ের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে বিএফআইইউর নির্ধারিত এক্সেল ফাইলে তার হিসাবসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য, চিহ্নিত প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় এবং উৎসে কর কর্তন সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে পূরণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক লেনদেনের এই তথ্য তলব প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যথাযথভাবে প্রযোজ্য হবে বলেও বিএফআইইউর ই-মেইলে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, বিএফআইইউর একটি নির্দিষ্ট পরিপত্রের ধারা উদ্ধৃত করে তলব করা এই সমস্ত সংবেদনশীল তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের ঢাকার কার্যলয়ে একদল দুর্বৃত্তের অতর্কিত ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা তার অফিসে প্রবেশ করে বিভিন্ন আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও অন্যান্য দামি জিনিসপত্র ভাঙচুর করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং সাধারণ নেটিজেনদের মধ্যে নানা ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে সালমান মুক্তাদির ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে অভিযোগ করেছিলেন যে রাজনৈতিক দল বিএনপির কিছু লোক তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিল এবং চাঁদা না দেওয়ায় তার অফিসে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে তার এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং নতুন এক বক্তব্যে জানান যে আদতে তার কাছে কেউ কোনো চাঁদা দাবি করেনি। তার এই আকস্মিক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয় এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে।
এই সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এসেছে। এ বিষয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন যে, সালমান মুক্তাদিরসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি ও বিপুল ভাইরাল জনপ্রিয়তা অর্জনকারী ব্যক্তিরা সমাজের যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকেন।
তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রভাবশালী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও তারকারা আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ এবং সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন বলে তিনি জোরালো আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের কার্যালয়ে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ডিজিটাল মিডিয়ার আচরণের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকেছে।
এর ওপর ভিত্তি করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার এই আকস্মিক ব্যাংক হিসাব তলব দেশের অনলাইন প্রভাবশালী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।