বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর নগরীর পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তীব্র যানজট পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছিল।
তবে এই পূর্বনির্ধারিত উচ্ছেদ অভিযানের একপর্যায়ে আকস্মিক উত্তেজনার সৃষ্টি হলে তা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ হকার ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ হয়ে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিত একাধিক যানে অগ্নিসংযোগ করেন।
একই সঙ্গে তারা পুলিশের একটি টহল গাড়ি এবং উচ্ছেদকাজে ব্যবহৃত একটি ভারী খননযন্ত্র বা এক্সেভেটর ভাঙচুর করেন। এই আকস্মিক সহিংসতার ফলে মিরপুর-১০ নম্বর ও এর আশপাশের এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ওই প্রধান সড়কে বেশ কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতোই মিরপুরের ফুটপাতগুলোকে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল।
সিটি করপোরেশনের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশের পাহারায় যখন উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছিল, তখন হঠাৎ করেই ওই এলাকার একটি বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।
এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি সেখানে উপস্থিত হকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উচ্ছেদ কার্যক্রমে নিয়োজিত সিটি করপোরেশনের কর্মীদের চরম অসতর্কতা এবং অপরিকল্পিতভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণেই এই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে।
এর ফলে তাদের বহু কষ্টে উপার্জিত অর্থে কেনা মূল্যবান জিনিসপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এই সীমাহীন ক্ষোভ ও হতাশার বশবর্তী হয়েই হকাররা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং একপর্যায়ে পুরো পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুনের লেলিহান শিখা এবং উচ্ছেদ অভিযানের ডামাডোলের মধ্যে হকাররা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ধাওয়া করতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা সিটি করপোরেশনের তিনটি বর্জ্যবাহী বড় গাড়িতে একযোগে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা গাড়ির আগুন এবং এর থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় চারপাশের আকাশ সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
শুধু এই অগ্নিসংযোগেই তারা ক্ষান্ত হননি; ক্ষোভের আগুনে ফুঁসতে থাকা ওই ব্যবসায়ীরা উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি ভারী খননযন্ত্রে লাঠিসোঁটা দিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করতে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে গেলে হকারদের তীব্র রোষানলে পড়েন তারাও।
একপর্যায়ে উত্তেজিত হকাররা পুলিশের একটি টহল গাড়িতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ব্যাপক ভাঙচুর করেন। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ভয়াবহ সহিংসতার ফলে ওই এলাকার সাধারণ বাসিন্দা, রাস্তা দিয়ে চলাচলরত পথচারী এবং বিভিন্ন বিপণিবিতানে কেনাকাটা করতে আগত ক্রেতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এই সংঘাতময় পরিস্থিতির বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সহিংস ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমকে পরিস্থিতির সুস্পষ্ট বিবরণ দিয়ে জানান যে, ফুটপাত উচ্ছেদ করার সময় হঠাৎ করেই একটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আকস্মিক আগুনের সূত্রপাত হলে উপস্থিত হকাররা চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার সুযোগ নিয়ে তারা সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন এবং পুলিশের গাড়ি ও একটি খননযন্ত্রে ভাঙচুর চালান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ ধৈর্যের সঙ্গে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছে যাতে কোনোভাবেই প্রাণহানির মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে।
তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি সুদক্ষ দল দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নিরলসভাবে কাজ শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রাণান্তকর চেষ্টায় আগুন খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আসে এবং নতুন করে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটার আর কোনো আশঙ্কা নেই বলে তিনি নিশ্চিত করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও নগর বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা একটি দীর্ঘদিনের, বহুমুখী ও অত্যন্ত জটিল আর্থসামাজিক সমস্যা।
নগরীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত মোড় এবং সড়কের পাশের প্রশস্ত ফুটপাতগুলো বছরের পর বছর ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া দখলে থাকায় সাধারণ পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ন্যূনতম কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না।
এর ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়, যা একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে ঢাকা শহরের নিত্যনৈমিত্তিক যানজট পরিস্থিতিকে চরম আকার ধারণ করতে বাধ্য করে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং দুই সিটি করপোরেশন এই নাগরিক সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত বদ্ধপরিকর এবং তারা দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিতভাবে এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। আধুনিক নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি উন্নত ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত ও বাধাহীন ফুটপাতের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সাধারণ নাগরিকদের সেই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থেই মূলত প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। তবে এই সমস্যার অপর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক দিকও রয়েছে, যা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই ফুটপাতকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভর করে ঢাকা শহরের হাজার হাজার নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন এই খেটে খাওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
যখনই যথাযথ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের কঠোর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়, তখনই এই দরিদ্র মানুষগুলোর আয়ের একমাত্র উৎসটি ধ্বংস হয়ে যায়। বিকল্প কোনো সম্মানজনক কর্মসংস্থান না থাকায় উচ্ছেদের পর তারা চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনযাপনের মুখে পড়েন।
জীবন ও পরিবার বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়েই তারা কিছুদিন পর আবারও সেই পুরোনো ফুটপাতে ফিরে আসতে বাধ্য হন। সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে বলপ্রয়োগ করে বা সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই গভীর সমস্যার কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান কখনোই সম্ভব নয়।
হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মার্কেট নির্মাণ বা নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা পরিচালনার মতো সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে প্রশাসন ও হকারদের মধ্যকার এই অন্তহীন সংঘাত চলতেই থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সুপরিকল্পিত ও বাসযোগ্য ঢাকা শহর গড়ে তোলা আমাদের সবারই একান্ত কাম্য। একজন পথচারীর নিরাপদ ফুটপাতে হাঁটার অধিকার যেমন সুনিশ্চিত করতে হবে, ঠিক তেমনি খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষগুলোর জীবন ও জীবিকার কথাও অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
মিরপুর-১০ নম্বরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল এই জটিল আর্থসামাজিক সমস্যার একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।
নিজেদের দাবি আদায় বা ক্ষোভ প্রকাশের জন্য সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক।
বর্তমানে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার পরিস্থিতি কিছুটা থমথমে থাকলেও বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।